আমরা প্রতিনিয়ত আমিষের ঘাটতি পূরণে খাবার তালিকায় মাছ ও মুরগি রাখি। এই খাবারে লুকিয়ে রয়েছে মরণব্যাধির উপাদান। এসব মাছ-মুরগি যে ফিড খায় সেই ফিডে অতিমাত্রায় ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসার মতো ভারি ধাতু রয়েছে। আর এসব ধাতু মাছ-মুরগির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর ফলে কিডনি বিকল, হাড় ক্ষয়, শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিতে স্থায়ী বাধাসহ ক্যানসারের মত রোগ হতে পারে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় এমন চিত্র ধরা পড়েছে।
জানা যায়, বর্তমানে দেশের বাজারে যেসব লাইসেন্সধারি মাছ-মুরগির ফিড রয়েছে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এসব ফিডের মান নির্ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, অতিমাত্রায় ক্রোমিয়ামের ফলে মানুষের লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হয়, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়। এমন কি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মত মরণব্যাধি হতে পারে। খাবারে অতিমাত্রায় ক্যাডমিয়াম থাকলে মানুষের দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল ও হাড় ক্ষয়ের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির কারণ হয়। ক্যাডমিয়াম একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ভারী ধাতু। একবার শরীরে প্রবেশ করলে প্রায় ১৬ থেকে ৩৮ বছর পর্যন্ত জমা থাকতে পারে। খাবারে অতিমাত্রায় সিসা থাকলে মানবদেহে তীব্র বিষক্রিয়া ঘটে— যা মস্তিষ্ক, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি, রক্তস্বল্পতা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে স্থায়ী বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিএসটিআই তাদের সার্ভিল্যান্স টিমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খোলা বাজারের পোল্ট্রি ও ফিস ফিড পণ্যের ২৯৪টি নমুনা সংগ্রহ করে। মান অনুযাই পোল্ট্রি ফিডে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৪০ মিলিগ্রাম থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো নমুনায় ক্রোমিয়ামের পরিমাণ ১৪৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া যায়। যা নির্ধারিত মানের চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি। এমন ভয়াবহ ফলাফল। বিএসটিআই তাদের পরীক্ষার ফল শিল্প মন্ত্রণালয়, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোকে অবহিত করে চিঠি দেয়।
জানা যায়, গত ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই বিএসটিআই যে চিঠি দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, পোল্ট্রি ফিড ও ফিস ফিড পণ্যের গুণগতমান যাচাইয়ের লক্ষ্যে বিএসটিআই’র সার্ভিল্যান্স টিম ৭৬টি নমুনা সংগ্রহ করে। এরমধ্যে ৫৭টিতে বেশি মাত্রায় ক্রোমিয়াম, ৭টিতে আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম, ৪টিতে লেড ও ক্রোমিয়াম, ১টিতে ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম এবং ৪টিতে লেড, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
৭৬টি নমুনার মধ্যে মাত্র ৩টি নমুনায় দেশের প্রচলিত মান পেয়েছে বিএসটিআই। পোল্ট্রি ফিড ও ফিস ফিড-এ মাত্রাতিরিক্ত ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম এবং লেড’র ন্যায় ভারি ধাতুর উপস্থিতি মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। পোল্ট্রি ও ফিস ফিডের মাধ্যমে এসব ভারি ধাতু মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা সেই চিঠিতে জানায় বিএসটিআই।
পোল্ট্রি ও ফিস ফিডের যে মান তাতে মত্স্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত লাইসেন্সধারি সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের উত্পাদিত পোল্ট্রি ফিড ও ফিস ফিড পণ্য বাংলাদেশ মান সনদ নতুন করে নির্ধারণের অনুরোধ জানায় বিএসটিআই।
গত ১০ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ট্যানারি বর্জ্য থেকে তৈরি পোল্ট্রি ফিডে ক্যান্সারের ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি প্রমাণিত সত্য। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু ব্যবহার করা হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবহার করে কম খরচে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্য তৈরি করে থাকে। এ ধরনের খাদ্য খাওয়ানো মুরগির মাংস ও ডিমে বিষাক্ত হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম জমা হয়, যা রান্নার তাপেও নষ্ট হয় না। এই মুরগি বা মাছ মানবদেহে প্রবেশ করলে তা থেকে ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, আলসার এবং কিডনি নষ্ট হওয়ার মত মারাত্মক জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পোল্টি ফিডের এই ভয়াবহ চিত্রের জন্য প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর দায়ী। তারা পণ্যের অনুমোদন দিয়ে বাজার মনিটরিং না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে। আর ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে মানের দিকে লক্ষ্য না করে পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করে।
বিএসটিআই’র উপপরিচালক (কৃষি ও খাদ্য) এনামুল হক বলেন, পোল্ট্রি ও ফিস ফিডের মান অত্যন্ত খারাপ। এটা আমরা ২০২৪ সালে ল্যাব পরীক্ষায় পাই। সারা দেশ থেকে ২৯৪টি নমুনা খোলাবাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়। সেখানে প্রায় প্রত্যেকটি নমুনায় অতিমাত্রায় ক্রোমিয়াম, পারদ, সিসা, নিকেলসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি পাই। এসব পণ্য আমাদের দেশেই বিক্রি হচ্ছে। এই খাবারের মাধ্যমে যেসব মাছ-মুরগি উত্পাদন হবে তা মানুষ খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। পরে আমাদের পরীক্ষার ফলাফল শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মত্স্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে জানাই। তবে ব্যবসায় খারাপ প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. মনজুর মোর্শেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, মাছ-মুরগি যদি ভালো খাবার খেতে না পারে তাহলে আমরা সেই মাছ-মুরগি খেলে শরীরের নানা সমস্যা হবে। বিএসটিআই তাদের পরীক্ষায় যে ফলাফল পেয়েছে তার আলোকে একটি কমিটি গঠন করা উচিত। সেই কমিটির কাজ হবে পোল্ট্রি ও ফিস ফিডে কিভাবে ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সীসার ন্যায় ভারি ধাতু আসছে তা খুঁজে বের করা। পরে সেই সোর্স বন্ধ করে দেওয়া।
পপুলার পোল্টি এন্ড ফিস ফিড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাদিকুল ইসলাম বলেন, বিএসটিআই কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ফিডে খারাপ মান পেয়েছে তার তালিকা প্রকাশ করা উচিত। তবে আমি আমার কথা বলতে পারি। আমার ফিডের মান কোনোভাবেই খারাপ হতে পারে না। অনেকে অনেক কিছু মিশায়, ফলে তারা কম দামে বিক্রি করতে পারে। আমার ফিড মান ভালো হওয়ায় উত্পাদন ব্যয় বেশি হয়। তাই দামও বেশি। ফলে আমাদের বিক্রি কম হয়। আর বিক্রি কম হওয়ায় উত্পাদনও কম করতে হচ্ছে। আমরা মেশিনের উত্পাদনের যে ক্ষমতা রয়েছে তার ৪ ভাগের এক ভাগ উত্পাদন করি। অনেকে খারাপ উপাদান দিয়ে ফিড তৈরি করে বাজারে কম দামে বিক্রি করে। তবে, খারাপ ফিড উত্পাদন বন্ধ হওয়া উচিত।
দেশে ৪ শতাধিক ফিডমিল বা ফিড কারখানা আছে। এর বাজারের আকার বর্তমানে ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। যার মধ্যে পোল্ট্রি ফিডের অংশ সবচেয়ে বেশি। পোল্ট্রি খাতের জন্য বছরে প্রায় ৬৫ লাখ টন ফিড বাজারজাত করা হয়। এ অবস্থায় পোল্ট্রি ফিডের মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।




Comments