স্কুলে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—এটি হবে কেবল ‘নামমাত্র’ পরীক্ষা, যার জন্য বাড়তি কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই; কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ভর্তি কোচিং বাণিজ্য। একদিকে চার-পাঁচ বছরের কোমলমতি শিশুদের কাঁধে চাপছে অনাকাঙ্ক্ষিত পরীক্ষার বোঝা ও মানসিক ট্রমা, অন্যদিকে শিক্ষানীতি ও নিয়মের স্পষ্টতার অভাবে অভিভাবকদের ওপর তৈরি হচ্ছে তীব্র অর্থনৈতিক ও মানসিক দুশ্চিন্তা। আনন্দময় শৈশব আর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার এই দ্বন্দ্বে বিপাকে পড়েছে হাজারো পরিবার।
দেশজুড়ে অলিগলিতে প্রচারণার হিড়িক: ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, উত্তরা, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা বহুগুণ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পন্সরড বিজ্ঞাপন, রাস্তার মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই ভর্তি শেষ করে নিয়মিত ক্লাস ও মডেল টেস্ট নেয়া শুরু করেছে। কোথাও চার মাসের বিশেষ কোর্স, আবার কোথাও পরীক্ষা পর্যন্ত টানা প্রস্তুতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও।
ফি-এর নামে কোটি টাকার বাণিজ্য: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিশুদের কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি ব্যাচ চালু করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং মাসিক বেতন ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা। বিশেষ কোর্সের নামেও মোটা অঙ্কের ফি হাঁকানো হচ্ছে। জিনায়াস, কোর ক্যাডেট একাডেমি, উইসডম, প্রয়াস, মাস্টারউইন, রাজউক কোচিং সেন্টারসহ অন্তত শতাধিক প্রতিষ্ঠান জোরেশোরে এই ব্যবসা চালাচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনে নানা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষকদের চাহিদাও বেড়েছে।
স্বনামধন্য স্কুল ও শৈশবের ওপর প্রভাব: মূলত ভিকারুননিসা নূন স্কুল, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি, আইডিয়াল স্কুল, রেসিডেনসিয়াল মডেল, ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয়, হলি ক্রস ও রাজউক উত্তরা মডেলের মতো স্বনামধন্য স্কুলে আসন পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতাই এই বাণিজ্যের মূল ভিত্তি। সরেজমিনে দেখা গেছে, মাত্র চার-পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও কোচিং সেন্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হচ্ছে। ২০২১ সালে লটারি চালুর পর এই ব্যবসা থমকে গেলেও, পরীক্ষার খবরে এখন সকাল, দুপুর ও বিকেলে তিন শিফটে ক্লাস চালানো হচ্ছে।
অনিশ্চয়তায় বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা: অভিভাবকদের মানসিক অনিশ্চয়তাই এই বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি। নিজের সন্তান পিছিয়ে পড়বে—এই আশঙ্কায় অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। খিলগাঁওয়ের অভিভাবক আনিসুর রহমান বলেন, ছোট বাচ্চাকে কোচিং করাতে চাইনি। কিন্তু অন্যরা যখন করছে, তখন না করালে আমার সন্তান পিছিয়ে পড়বে কি না, এই ভয় থেকেই ভর্তি করিয়েছি। মিরপুরের নাঈমা মিতু জানান, পরীক্ষার ধরন কেমন হবে না বুঝে কোচিংয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। এর জন্য সংসারের অন্য খাতের ব্যয়ও কমাতে হচ্ছে। উত্তরার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, সরকার দ্রুত একটি স্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করলে অভিভাবকদের এই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যেত।
উদ্বেগ নিরসনে সরকারের বক্তব্য: অভিভাবকদের এই উদ্বেগ নিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এটি হবে একটি নামমাত্র মূল্যায়ন এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা, যাতে কোচিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন না হয়। অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই এবং মাধ্যমিক সংযুক্ত শাখাগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখভাল করবে।
লটারি থেকে আবারও ভর্তি পরীক্ষার ইতিহাস: নব্বইয়ের দশক থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। তবে ছোট শিশুদের ওপর চাপ কমানো ও অনিয়ম রুখতে ২০১১ সালে প্রথম শ্রেণিতে এবং ২০২১ সালে করোনা মহামারির কারণে সব শ্রেণিতে শতভাগ লটারি চালু করা হয়। সম্প্রতি ‘মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না’—এমন দাবির মুখে গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় লটারি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নতুন মূল্যায়নের স্পষ্ট নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞ মতামত ও অনিয়মের শঙ্কা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থাই একমাত্র শিশুবান্ধব সমাধান। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগাম ঘোষণার কারণে কোচিং সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়েছে। কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা না নিলে অতীতে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্ন ফাঁস ও অনিয়ম হতো, তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।




Comments