Image description

দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশের কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত ঘিরে। অথচ সেই খাতের উদ্যোক্তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে। ব্যবসা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই মূলধন হারিয়ে প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ টিকে আছেন ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে, কেউ আবার উচ্চ সুদে ধার করা টাকায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। 

অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মিলেই এসএমই খাতকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদ, টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, করের চাপ এবং বড় প্রতিষ্ঠানের অসম প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্রমেই বাজার হারাচ্ছেন। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। অথচ চীনে এই অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫২, জাপানে ৫০, ভিয়েতনামে ৪৫, পাকিস্তানে ৪০ এবং ভারতে ৩৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের এসএমই খাতের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাবে সেই সম্ভাবনা পূর্ণতা পাচ্ছে না।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়ন। ব্যাংকে গেলেই চাওয়া হয় অতিরিক্ত জামানত, দীর্ঘ কাগজপত্র ও নানা শর্ত। ফলে অনেকেই অনানুষ্ঠানিক উত্স থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। তারা বলছেন, বড় প্রতিষ্ঠানের মতো একই প্রশাসনিক কাঠামো ও করব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয় ক্ষুদ্র ব্যবসাকেও। ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট, আয়কর, কাস্টমস—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। 

বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলেন, অনেক নতুন উদ্যোক্তা বাসা থেকেই ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু বাধ্যতামূলক অফিস দেখিয়ে ট্রেড লাইসেন্স নেয়ার নিয়ম তাদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অস্থায়ী ট্রেড লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব দেন। শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স নবায়নেই ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। দ্রুত সেবা পেতে অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয়। এনবিআরের পুরোনো ফাইল দেখিয়ে হয়রানির অভিযোগও করেন তারা।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০২২-২৩ সাল থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এতে বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। তার ভাষায়, ‘বড় প্রতিষ্ঠান কিছুদিন লোকসান সহ্য করতে পারে, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সেই সামর্থ্য নেই। টাকার অবমূল্যায়নে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, আবার সুদের হার বাড়ায় অর্থায়নের ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে তারা দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা নীতি, সহজ নিবন্ধন, কর-অনুবর্তিতা সহজ করা এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত না করলে সংকট আরও বাড়বে।’ 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উত্পাদন ও ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় এগোচ্ছে, তখন দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনও সেই পরিবর্তনের বাইরে। দেশীয় বাজারে বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিপণনে সীমাবদ্ধতা এবং বড় ক্রয়াদেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ কম থাকায় উত্পাদন বাড়িয়েও বাজার পাচ্ছেন না তারা। নারী উদ্যোক্তাদের পথ আরও কঠিন। পুরুষ উদ্যোক্তারা পরিবার থেকে সহজে অর্থসহায়তা পেলেও নারীরা সেই সুযোগ কম পান। তাদের জন্য অর্থায়নের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পারিবারিক সহায়তা ও সম্পদের মালিকানার সীমাবদ্ধতা।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, ডিজিটাল মার্কেটিং ও এআইভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং এক অঙ্কের সুদে ঋণের ব্যবস্থা জরুরি। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সিএমএসএমই উদ্যোক্তার সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি এবং কর্মরত জনবল প্রায় ৩ কোটি ৬ লাখ। কিন্তু কতজন উদ্যোক্তা প্রতিবছর ব্যবসা থেকে ঝরে পড়ছেন—তার কোনো সমন্বিত সরকারি তথ্য নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসএমই খাতের সংকট কেবল অর্থের নয়; এটি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটও। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, সহজ নিবন্ধন, কর ও প্রশাসনিক সংস্কার, প্রযুক্তি গ্রহণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং সরকারি ক্রয়ে এসএমইর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় এই খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের ভাষায়, এসএমই খাত শক্তিশালী না হলে কর্মসংস্থান বাড়ানো, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি-নির্ভরতা কমানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এখন প্রয়োজন শুধু ঋণ নয়—একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সত্যিকারের উদ্যোক্তাবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ। 

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, জাতীয় এসএমই নিবন্ধন চালু হলে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত সংখ্যা, টিকে থাকা ও ঝরে পড়ার হার সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সবাই উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হবেন—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে সহজ ঋণ, বাজারসংযোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে হবে। তবে সহায়তা হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক, ঢালাও নয়।