Image description

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) একজনের, কিন্তু সেই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ইস্যু হয়েছে আরেকজনের ই-পাসপোর্ট। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যার পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি তখন সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে করা ওই আবেদন থেকে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করেছে ঢাকার মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। এতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচয় যাচাই ও বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেনীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল, পিতা ওবায়দুল হক এবং মাতা জাহানারা বেগমের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৮৭২৫৭৯৩৪১১ ব্যবহার করে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার সান্দিরা বাজার এলাকার একটি ঠিকানা দেখিয়ে নতুন একটি ই-পাসপোর্টের আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের নম্বর ৪২১০-০০০১৩৫২৬৬। আবেদনের বিপরীতে ২০২৪ সালের ২৬ মে এ১৫৫৩৩০৯৬ নম্বরের একটি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে মোহাম্মদপুর পাসপোর্ট অফিস।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাসেলের জন্মনিবন্ধন নম্বর ১৯৯৩৩০১২৯৪৩০২৬৯৯৬ ব্যবহার করে এর আগেই তার নামে তিনটি পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছিল। সর্বশেষ ইকে০৫০২০৯৪ নম্বরের পাসপোর্টটি ৯ মে ২০২২ থেকে ৮ মে ২০২৭ পর্যন্ত মেয়াদে বৈধ রয়েছে। ফলে একই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নতুন আরেকটি পাসপোর্ট ইস্যু হওয়ার কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ই-পাসপোর্টটি ইস্যুর সময় রাসেল সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা তাকে জানান, তার নামে আরেকটি ই-পাসপোর্ট রয়েছে। পরে তিনি জানতে পারেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অন্য একজনের নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আবেদনপত্রে যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ওই এলাকায় এমন নামের কোনো ব্যক্তি কখনো বসবাস করেননি। এমনকি আবেদনপত্রে উল্লেখ করা পিতা-মাতার নামেও স্থানীয়ভাবে কাউকে পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য যাচাই করে জানা গেছে, আবেদনপত্রে ব্যবহৃত জাতীয় পরিচয়পত্রটি প্রকৃতপক্ষে ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেলের।

একাধিক সূত্রের দাবি, রাসেলের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যার নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন বরং একজন রোহিঙ্গা। যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু পরিচয় জালিয়াতিই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।

এ বিষয়ে রাসেলের দেয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার বোন ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, রাসেল দেশে এসে আবার বিদেশে চলে গেছেন। তার পাসপোর্ট-সংক্রান্ত একটি সমস্যা হয়েছে এবং সেটি সমাধানের জন্য নতুন করে অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে।

তবে একটি সূত্র ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। সূত্রটির দাবি, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাসেল নিজেই পরিচিত কাউকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে আরেকটি পাসপোর্ট তৈরির সুযোগ করে দিয়ে থাকতে পারেন।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আবেদন জমার সময়ই বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল। তার ভাষ্য, ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি তোলার সময়ও অমিল ধরা পড়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়নি। সিস্টেম কীভাবে আবেদনটি অনুমোদন করেছে, তা তদন্তের বিষয়। এখানে অসৎ উদ্দেশ্য বা দায়িত্বে গাফিলতির বিষয় উড়িয়ে দেয়া যায় না।’

নথিপত্র অনুযায়ী, দেশে ফিরে রাসেল তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ইস্যু হওয়া নতুন ই-পাসপোর্টটি বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন। তবে কীভাবে একই জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভিন্ন ব্যক্তির নামে ই-পাসপোর্ট ইস্যু হলো, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার মূল শক্তিই হলো বায়োমেট্রিক তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সমন্বিত যাচাই। সেখানে একই এনআইডি ব্যবহার করে ভিন্ন ব্যক্তি কীভাবে পাসপোর্ট পেলেন এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা জরুরি। অন্যথায় জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ঘটনাটি শুধু একটি পরিচয় জালিয়াতির অভিযোগ নয়। এটি দেশের ই-পাসপোর্ট ব্যবস্থার পরিচয় যাচাই, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী একটি আবেদন করেছে। সেটি বর্তমানে তদন্তনাধীন। আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। তাই এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি আর কিছু বলতে পারছি না। তবে দুটি পাসপোর্টই এখনো অ্যাকটিভ রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।