ক্ষমতার অলিন্দে এখন একটাই বার্তা—কাজ দেখাতে হবে, না হলে জায়গা ছাড়তে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা নয়, কর্মদক্ষতাই হবে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের দায়িত্বে থাকা বা না থাকার প্রধান মানদণ্ড। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেয়া এমন বার্তায় স্পষ্ট হয়েছে, ফলাফল দেখাতে ব্যর্থ হলে যেকোনো সময় মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদে পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারি সূত্র বলছে, এবার আর অতীতের মতো কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রাখার নীতি অনুসরণ করতে চায় না সরকার। জনসেবা, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই মূল্যায়ন হবে মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পারফরম্যান্স। যদিও মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি, তবুও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। কর্মসম্পাদন, সময়ানুবর্তিতা, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং সরকারি অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সক্ষমতার ভিত্তিতে নিয়মিত মূল্যায়ন চলছে বলেও একাধিক সূত্রের দাবি।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। কেউ প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে না পারলে প্রয়োজন অনুযায়ী দপ্তর পুনর্বণ্টন বা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেবেন।’
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করেছেন, একটি উপদেষ্টা পরিষদ তৈরি করেছেন। ওনার যদি কখনো মনে হয় কেউ ভালো পারফর্ম করতে পারছেন না, তার জায়গায় দপ্তর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেয়া—এগুলো প্রয়োজন হলে তিনি করবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো সিদ্ধান্ত আরও ভালো করার সুযোগ থাকলে তিনি সেটি করবেন।’
সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে বা পরে রদবদল হতে পারে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে নয়, বরং কাজের প্রয়োজনে এবং পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্যের পরপরই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কর্মদক্ষতা কীভাবে মূল্যায়ন হবে, কারা দায়িত্বে থাকবেন আর কারা বাদ পড়তে পারেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সে লক্ষ্যেই সরকার গঠনের শুরু থেকেই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তারা বলছেন, দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থানকালে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুশাসনের নানা দিক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তারেক রহমান। সরকার পরিচালনায় তিনি সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। সরকারের নেয়া প্রতিটি জরুরি পদক্ষেপ সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না এবং মন্ত্রীরা তাদের দায়িত্ব পরিচালনায় কতটা সক্রিয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও আধুনিক নজরদারি বজায় রাখছেন।
সরকারি প্রশাসনিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচকের (কেপিআই) মাধ্যমে পুরো সরকারের পারফরম্যান্স মনিটর করছেন তিনি। এসব তদারকির মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স ও সচিবালয়ে সময়ানুবর্তিতা প্রদর্শন। সরকারি চাকরিতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি দূর করতে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সচিবদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্র্যাকিং ও অনলাইন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রতিদিন সকালে সচিবালয় ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সূচি পর্যবেক্ষণ করেন। কোনো মন্ত্রী বা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের পর অফিসে উপস্থিত হলে বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তাত্ক্ষণিক কৈফিয়ত তলব করা হচ্ছে।
তাছাড়া ৩১ দফা বাস্তবায়ন ও জরুরি অগ্রাধিকার মনিটর করা হচ্ছে। বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করেই জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই ৩১ দফার কতটুকু কোন মন্ত্রণালয়ে কতখানি অগ্রগতি লাভ করেছে, সে সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিতে হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিচার এবং জ্বালানি খাতের সংস্কারসংক্রান্ত পদক্ষেপে সামান্যতম অবহেলা বা শ্লথগতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।
‘ড্যাশবোর্ড মনিটরিং’ ও মাঠপর্যায়ের ফিডব্যাককে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পর্যবেক্ষণ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সার্বক্ষণিক ‘অ্যাকশন সেন্টার’ বা ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড কার্যকর রয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের বিশেষ টিমের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ সরকারের সেবা থেকে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছে, তার বাস্তব চিত্র সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছায়। যেসব মন্ত্রী বা উপদেষ্টা কেবল সচিবালয়নির্ভর হয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে আছেন এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি কম করছেন, ড্যাশবোর্ডে তাদের রেটিং ইতোমধ্যে নিচের দিকে নেমে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যের পর থেকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে নতুন করে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা মনে করছেন, এ ধরনের কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করেই হয়তো সরকার মন্ত্রী-উপদেষ্টা পদে পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করবে।
অবশ্য সরকার পরিচালনা এবং মন্ত্রীদের যোগ্যতা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি রয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মন্ত্রীদের মূল্যায়নে যে মডেলগুলো ব্যবহূত হয়, সেগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগের চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যুক্তরাজ্য: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি ডেডিকেটেড ‘ডেলিভারি ইউনিট’ থাকে। সেখানে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক মন্ত্রীকে একটি লিখিত ‘ম্যান্ডেট লেটার’ দেন, যেখানে পরবর্তী ৬ মাস বা ১ বছরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকে। এছাড়া ‘সিলেক্ট কমিটি’র মাধ্যমে সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এখন মন্ত্রীদের টার্গেট বেঁধে দিয়ে কাজ আদায় করে নেয়ার এই ব্রিটিশ নীতি অনুসরণ করছে।
সিঙ্গাপুর: বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার দেশ সিঙ্গাপুরে মন্ত্রীদের মূল্যায়ন সরাসরি তাদের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো সূচকের ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রীদের বোনাস ও মেয়াদ নির্ধারিত হয়। কাজে ব্যর্থ হলে বা প্রটোকল ভঙ্গ করলে সেখানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারেক রহমানের বর্তমান সরকারেও এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ছোঁয়া স্পষ্ট।
কানাডা ও নিউজিল্যান্ড: কানাডায় জাস্টিন ট্রুডোর সরকার মন্ত্রীদের দেয়া দায়িত্ব ও তার বাস্তবায়নের চিত্র ‘ম্যান্ডেট লেটার ট্র্যাকার’ নামে পাবলিক ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডেও সরকারি পরিষেবার মান উন্নয়ন এবং মন্ত্রীদের উপস্থিতির ভিত্তিতে র্যাঙ্কিং করা হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও কাজের স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সেই পথেই হাঁটছে।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের পারফরম্যান্স যাচাইয়ের পদ্ধতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাজের ভালোমন্দ যাচাই করার জন্য কী কী মানদণ্ড বা সূচক নির্ধারণ করেছেন, তা আমাদের জানা নেই। সূচকগুলো জানা থাকলে এ বিষয়ে হয়তো বিস্তারিত মন্তব্য করা যেত। তবে মন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের বিচার বা মূল্যায়ন অবশ্যই হওয়া উচিত।




Comments