Image description

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ইতিহাসের পাতায় আলাদা করে লেখা থাকবে চারটি দিন। ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৩ ও ৪ আগস্ট। এই চারটি দিন চট্টগ্রামের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল শিক্ষার্থীদের রক্তে। আন্দোলনকারীদের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নৃশংস হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। ন্যক্কারজনকভাবে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় পুলিশও। 

১৬ জুলাই দুপুর তিনটায় যোলশহর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পালনের কথা ছিল। কর্মসূচির খবর পেয়ে আগে থেকেই চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে দুই শতাধিক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী সেখানে অবস্থান নেন। তাদের অবস্থানের কথা জানার পর আন্দোলনকারীরা কর্মসূচির স্থান পরিবর্তন করে মুরাদপুরে অবস্থান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে প্রথমে প্রায় দুই হাজার আন্দোলনকারী জড়ো হয়।

ওইদিন বিকাল পৌনে ৫টার দিকে আন্দোলনকারীদের কিছু অংশ আবার বহদ্দারহাট এলাকায় অবস্থান নেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি ও রাসেল আহমেদ যোগ দিলে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বেড়ে প্রায় তিন হাজারে পৌঁছে। পরে আন্দোলনকারীরা একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুললে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা জিইসির দিকে সরে যায়। এরপর আন্দোলনকারীরা পুনরায় মুরাদপুরে অবস্থান নেন। 

বিকাল ৫টার দিকে মুরাদপুর এলাকায় রাস্তার দুই পাশে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। পশ্চিম পাশে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এবং পূর্ব পাশে আন্দোলনকারীরা। এক পাশে ছিল পুলিশ। দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় চরম ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। একপর্যায়ে রাস্তার পূর্ব পাশে আটকা পড়েন অন্তত একশ শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ ওয়াসিম আকরামও। এ সময় ওয়াসিম আকরাম পুলিশকে অনুরোধ করেন, আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের পূর্ব পাশে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার। কিন্তু পুলিশ তাতে কান দেয়নি। জীবন বাঁচাতে পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম আকরাম। পরে আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এরপর আন্দোলনকারীরা একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পূর্ব পাশে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদে পশ্চিম পাশে নিয়ে আসেন। ওই সময় পুলিশ ঘটনাস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করলেও সংঘর্ষ চলতে থাকে। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফয়সাল আহমেদ শান্ত গুলিবিদ্ধ হন। তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষ চলাকালে সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে পথচারী ও ফার্নিচারকর্মী মো. ফারুকও গুলিবিদ্ধ হন। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। অন্ধকার নেমে এলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে যায়। ওই দিনের সংঘর্ষে রক্তাক্ত হন শতাধিক আন্দোলনকারী।

১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার। দেশজুড়ে ছিল ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। জোহরের নামাজের পর নগরের লালদিঘী ময়দানে আন্দোলনে নিহত হওয়া তিন শহীদের গায়েবানা জানাজার সিদ্ধান্ত ছিল। পুলিশ কর্মসূচিতে সরাসরি বাধা না দিলেও বারবার দ্রুত জানাজা শেষ করার তাগিদ দেয়। তিন সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা শেষ হয়।

এরপর দুপুর সাড়ে ৩টার পর থেকে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বিকাল ৪টার দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হূদয় চন্দ্র তরুয়া। পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ওই দিনের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন অন্তত ৩০ জন। জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম নগরে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয় বহদ্দারহাট-মুরাদপুর এলাকায় সংঘর্ষে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেদিন সন্ধ্যায় সরকারের নির্দেশে দেশজুড়ে মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে কার্যত পুরো দেশ ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড, উভয় ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা জামে মসজিদে আন্দোলনে নিহত তিন শহীদের গায়েবানা জানাজা হয়। জানাজায় ইমামতি করেন মসজিদের খতিব মাওলানা আনোয়ার উদ্দিন আল জাবেরী। তিনি শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দীর্ঘ মোনাজাত করেন। জানাজা শেষে তিন হাজারের বেশি মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি আন্দরকিল্লা থেকে শুরু হয়ে নিউমার্কেট এলাকা প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। 

এদিন দুপুর তিনটায় বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিএমইউজে) যৌথ উদ্যোগে সিএমইউজের কার্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা ব্যানারসহ একটি মিছিল নিয়ে নগরের বিএনপির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে কর্মসূচি শেষ করে। ওইদিন আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম নগরে আর কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি দেখা যায়নি। এরপর দেশজুড়ে টানা পাঁচদিন ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর ২৩ জুলাই ব্যাংকিং কার্যক্রম ও জরুরি সেবার প্রয়োজন বিবেচনায় সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয়। ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হলেও ফেসবুকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরো কিছুদিন বন্ধ রাখা হয়।

৩ আগস্ট। ১৪ দিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বিশাল সমাবেশের ডাক দেন। ওই সমাবেশ থেকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবিতে ‘এক দফা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হয়। এদিন দুপুর ২টা থেকে আন্দোলনকারীরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ব্যানারবিহীনভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও নানা পেশার মানুষ অংশ নেন। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে ওইদিনের কর্মসূচি শেষ হয়।

৪ আগস্ট। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সকাল ১১টায় নিউমার্কেট এলাকায় কর্মসূচির ঘোষণা দেন। একইদিন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়। সকাল ১১টার পর থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সিটি কলেজ এলাকায় জড়ো হতে থাকে। 

দুপুর দেড়টার দিকে হঠাত্ প্রায় ৪ হাজার আন্দোলনকারীর ওপর পুলিশসহ প্রায় ৫০০ জন অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মী হামলা চালায়। তারা কিরিচ, রামদাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একযোগে হামলা চালায়। সিটি কলেজ, কোতোয়ালী ও থিয়েটার ইনস্টিটিউট। এ  তিনদিক থেকে চালানো হয় হামলা। এসময় পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে টিয়ারশেল ও ছররা গুলি চালায়। হামলার পরপর আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে ছুটে যান। অনেকে আশপাশের মার্কেট ও দোকানে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে তাদের আশ্রয় দেন। ওইদিন পুলিশের ছররা গুলিতে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। 

দুপুর আড়াইটার দিকে হামলার পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া আন্দোলনকারীদের একটি অংশ আত্মরক্ষায় নগরের টাইগারপাস মোড়ে জড়ো হন। সেখানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান নেন। এ সময় পুলিশের উপস্থিতিতে সিআরবি, দেওয়ানহাট, লালখানবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। তখন দুপুর ৩টা। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কার্যত আটকা পড়ে যান। তারা ফেসবুক লাইভে এসে জানান, চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় কোথাও যেতে পারছেন না। জীবন রক্ষায় তারা সাহায্যের আকুতি জানান।

লাইভ সম্প্রচারের প্রায় ৪৫ মিনিট পর, অর্থাৎ বিকাল ৪টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দল টাইগারপাস এলাকায় পৌঁছায়। সেনাবাহিনী এসে শিক্ষার্থীদের সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে পুলিশসহ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়। এরপর সেনাবাহিনী মাইকে ঘোষণা দিতে দিতে আকাশে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। ওই সময় সেনাবাহিনীর কারণে প্রাণে বেঁচে যান প্রায় দেড় হাজার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী।