Image description

রঙ-তুলির খেলায় শিশুমনের কল্পনা যখন ক্যানভাসে রূপ নেয়, তখন সেই দৃশ্য যে কারো হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর তক্ষশিলা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সেই দৃশ্যেরই সাক্ষী হলেন উপস্থিত অভিভাবক, শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। 

২৭ ধানমন্ডি এর উদ্যোগে ও তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হলো "সংস্কৃতিই জাগরণের প্রথম সূর্য" শীর্ষক চিত্রাঙ্কন উৎসব ২০২৬। শিশুদের সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও শিল্পচর্চার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত এই উৎসবে রাজধানীর দশেরও অধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে শিশুদের কলরবে। উৎসবের সূচনা হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী রবীন্দ্রসংগীত "আমাদের ভয় কাহারে" গেয়ে। তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলাম এবং ২৭ ধানমন্ডি এর ফজলুল কবীর তুহিন শিশুশিল্পী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে নিয়ে সম্মিলিত কণ্ঠে গানটিতে অংশগ্রহণ করেন। উদ্বোধনী পর্বের এই সম্মিলিত সংগীত পরিবেশনা উপস্থিত সকলের মধ্যে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে, যা যেন গোটা আয়োজনের সুর বেঁধে দেয়।

এরপর শুরু হয় মূল আকর্ষণ, ক্ষুদে চিত্রশিল্পীদের রং-তুলির প্রতিযোগিতা। বয়সভিত্তিক তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয় প্রতিযোগিতাকে। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ক-বিভাগের বিষয়বস্তু ছিল "হৃদয়ে আঁকা বাংলাদেশ", চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির খ-বিভাগে বিষয় ছিল "আমার আঁকায় অমর যাঁরা", আর সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির গ-বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলি চালায় "ছোট হাতে বড় শপথ" শিরোনামের ভাবনা নিয়ে। প্রতিটি বিভাগেই দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন বয়সের শিশুদের চোখে দেশ, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন কতটা রঙিন হয়ে ধরা দিতে পারে।

প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুর হাতে সনদপত্র ও উপহার তুলে দেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, কিরীটী রঞ্জন বিশ্বাস, শামসুল আলম আজাদ। 

পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ থেকে সেরা পাঁচজন করে মোট পনেরো জন শিক্ষার্থীকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার হাতে নিয়ে খুদে শিল্পীদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা উচ্ছ্বাস যেন প্রমাণ করে দেয়, সৃজনশীলতার স্বীকৃতি বয়স নির্বিশেষে সবার কাছেই কতটা মূল্যবান।

উৎসব সম্পর্কে তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলাম বলেন, "একটি শিশু যখন রং-তুলি হাতে নেয়, তখন সে শুধু একটি ছবি আঁকে না, বরং তার ভেতরের ভাবনা, স্বপ্ন আর দেশের প্রতি ভালোবাসাকে প্রকাশ করার একটি ভাষা খুঁজে পায়। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরেও এই ভাষাটা রপ্ত করুক। শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া প্রকৃত মানবিক মানুষ গড়ে তোলা সম্ভব নয়, আর সেই বিশ্বাস থেকেই তক্ষশিলা বিদ্যালয় বরাবরই এমন আয়োজনে যুক্ত থাকে।"

আয়োজনের উদ্যোক্তা ২৭ ধানমন্ডির ফজলুল কবীর তুহিন জানান, "শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের প্রতিনিধি। আজ তারা যে বাংলাদেশ রং দিয়ে এঁকেছে, আগামী দিনে সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্বও তাদেরই কাঁধে। আমরা চাই, প্রতিটি শিশু তার সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করার সাহস পাক। সংস্কৃতিচর্চাই একটি জাতিকে সত্যিকারের জাগরণের পথ দেখাতে পারে।"

উৎসবের আয়োজকরা বিশ্বাস করেন, শৈশবেই যদি একটি শিশুর মনে শিল্প, সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমের বীজ বোনা যায়, তবে ভবিষ্যতে সে কেবল একজন দক্ষ মানুষই নয়, একজন সংবেদনশীল ও মানবিক নাগরিক হয়েও গড়ে উঠবে। পরীক্ষা আর প্রতিযোগিতার চাপে ভারাক্রান্ত শৈশবে এমন সৃজনশীল আয়োজন শিশুদের জন্য যেমন আনন্দের খোরাক জোগায়, তেমনি খুলে দেয় নিজেকে প্রকাশের নতুন এক জানালা।