একসময় ন্যায্যমূল্যের অভাব, উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছিল দেশের ‘সোনালি আঁশ’ পাটের ঐতিহ্য। তবে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার এবং চলতি মৌসুমে আকর্ষণীয় বাজারদরের কারণে রাজশাহীতে আবারও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। মৌসুমের শুরুতেই প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ায় চাষিদের মুখে ফিরেছে হাসি।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, আগাম জাতের পাট কাটার কাজ প্রায় শেষ। কোথাও চলছে জাগ দেয়া, কোথাও আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে বাজারে নতুন পাট বিক্রি শুরু করেছেন। যেসব জমিতে পাট এখনও পরিপক্ব হয়নি, সেখানে কাটার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে পাট কাটার পর দ্রুত আমন ধান রোপণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কৃষকরা।
গত সোমবার সকালে পবা উপজেলার নওহাটা হাটে গিয়ে দেখা যায়, নতুন পাটের বেচাকেনা জমে উঠেছে। মানভেদে প্রতি মণ নতুন পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। আগাম পাটের সরবরাহ বাড়লেও বাজারদর নিয়ে সন্তুষ্ট কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
পাট ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন জানান, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় কিনলেও এবার কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়। তার ভাষায়, গত বছরের তুলনায় এবারের বাজার অনেক ভালো।
পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু আহমেদ বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ মণ ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২ মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে সব খরচ বাদে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
একই উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আলীম জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এবার অনুকূল আবহাওয়ায় প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে উত্পাদন খরচ বাদ দিয়েও প্রতি বিঘায় প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। তবে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
হরিপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ফলন ভালো হলেও শ্রমিক সংকট এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাবে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান হলে কৃষকের লাভ আরও বাড়বে।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর।
রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি। সময়মতো বৃষ্টিপাত ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় ফলনও ভালো হয়েছে। বর্তমান বাজারদর বজায় থাকলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন, মৌসুমজুড়ে বর্তমান বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে আগামী বছর আরও বেশি কৃষক পাট চাষে আগ্রহী হবেন।
অন্যদিকে পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছরে জেলায় সম্ভাব্য পাট উত্পাদন ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল, যা গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় আগাম চাষিরা ভালো লাভের আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পাট জাগ দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এবং উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।




Comments