যশোরের হাড়কাঁপানো শীত: মাটির চুলার ওমে বিড়ালের মায়াবী আশ্রয়
পৌষের শেষলগ্নে এসে প্রকৃতিতে এখন শীতের প্রবল দাপট। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা যশোরে জেঁকে বসেছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। কুয়াশার ঘন চাদরে ঢাকা পড়ছে ভোরের সূর্য, আর হাড়কাঁপানো হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। তবে এই বৈরী প্রকৃতির মাঝেও যশোরের গ্রামগুলোতে দেখা মিলছে এক অকৃত্রিম ও মায়াবী দৃশ্যের। তীব্র শীত থেকে বাঁচতে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতির অবলা প্রাণীরাও খুঁজে নিচ্ছে টিকে থাকার নিজস্ব পথ।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে যশোরের কেশবপুর উপজেলার আটন্ডা গ্রামে দেখা গেছে তেমনই এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। গ্রামীণ বধূরা যখন কনকনে ভোরে মাটির চুলায় রান্না শুরু করেন, ঠিক তখনই সেখানে হাজির হয় বাড়ির আদুরে বিড়ালটি। আগুনের হালকা আঁচ আর মাটির চুলার ওম যেন তার কাছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা স্বর্গ। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মাটির চুলার গা ঘেঁষে চোখ বুজে বিড়ালটির শুয়ে থাকার দৃশ্যটি যেন গ্রামবাংলার এক চিরায়িত ও শান্ত প্রতিচ্ছবি।
যশোরের এই অঞ্চলে শীতকালে গৃহবধূরা বাড়ির বাইরে বা বারান্দায় মাটির চুলা তৈরি করে রান্না করেন। রান্নার পর চুলার সেই অবশিষ্ট তাপ দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। একটি সাদা-ধূসর রঙের বিড়াল সেই চুলার পাশে পরম আস্থায় কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। মানুষের তৈরি এই উষ্ণতাকে সে আপন করে নিয়েছে শীত নিবারণের একমাত্র উপায় হিসেবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিকূলতার মাঝেও প্রাণের সাথে প্রাণের মিতালি কীভাবে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় শহরে আজ গ্যাসের চুলা বা ইলেকট্রিক হিটার এসেছে, কিন্তু গ্রামের এই মাটির চুলাগুলো আজও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আছে। এই চুলার পাশে বসে দাদী-নানীদের রূপকথার গল্প শোনা কিংবা পোষা প্রাণীদের সাথে অলস সময় কাটানোর দৃশ্যগুলো আজ কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ। শীতের এই সকালে বিড়ালটির শান্ত সমর্পণ আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা কমিয়ে কিছুটা থামতে বলে। এটি কোনো সাজানো দৃশ্য নয়, বরং প্রকৃতির এক সহজাত সারল্য।
শীতের এই তীব্রতায় আমরা যখন লেপ-কম্বল বা গরম কাপড়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখি, তখন এই অবলা প্রাণীদের কষ্ট অনেক সময় আমাদের নজরে আসে না। আটন্ডা গ্রামের এই বিড়ালটি হয়তো কোনো একটি পরিবারের মায়ায় একটু আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু অসংখ্য প্রাণী এখনও খোলা আকাশের নিচে কাঁপছে। এই দৃশ্যটি আমাদের মানবিক হওয়ার শিক্ষা দেয়। প্রকৃতির এই মায়া আমাদের শেখায়, সহমর্মিতা থাকলে খুব সাধারণ কিছুর মাঝেই শান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
যশোরের দিগন্তজোড়া মাঠ আর কুয়াশা ঢাকা মেঠোপথ পেরিয়ে এই ছোট্ট বিড়ালটির উষ্ণতা খোঁজার গল্পটি যেন কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের মমতাময়ী স্পন্দন। প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের এই নিবিড় বন্ধন অটুট থাকুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যাশা।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments