Image description

সিলেটের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘চুঙ্গাপুড়া’ পিঠা। শীতের কনকনে রাতে খড়কুটোর আগুনে পোড়া বাঁশের ভেতর থেকে বের হওয়া বিন্নি ধানের সুবাসিত এই পিঠা একসময় সিলেটের ঘরে ঘরে তৈরি হতো। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং উপকরণের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই চুঙ্গাপুড়া পিঠা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

একসময় শীতের রাতে গ্রামীণ জনপদে খড়কুটো জ্বালিয়ে রাতভর চুঙ্গাপুড়ার উৎসব চলত। বড় বাজারগুলোতে বসত মাছের মেলা। সেখান থেকে রুই, কাতলা, বোয়াল বা পাবদা মাছ কিনে এনে হালকা মসলায় ভেজে (আঞ্চলিক ভাষায় ‘মাছ বিরাণ’) পরিবেশন করা হতো এই পিঠা। মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের এই উৎসব ছিল দেখার মতো।

বর্তমানে চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ‘ঢলু বাঁশ’ ও ‘বিন্নি ধানের চাল’ (বিরইন চাল) সরবরাহ অনেক কমে গেছে। মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর ও কমলগঞ্জের বিভিন্ন টিলা এবং চা-বাগানের নির্জন স্থানে প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। তবে বনদস্যু ও পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় এখন ঢলু বাঁশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। সামান্য কিছু স্থানে পাওয়া গেলেও বাজারে এর দাম আকাশচুম্বী।

চুঙ্গাপুড়ার জন্য ঢলু বাঁশই কেন প্রয়োজন? বিশেষজ্ঞরা জানান, এই বাঁশের ভেতরে এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ও রস থাকে, যা আগুনের তাপে বাঁশকে পুড়তে বাধা দেয়; কিন্তু ভেতরের চালকে সুন্দরভাবে সিদ্ধ করে ফেলে। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে তা মোমবাতির মতো মসৃণভাবে চুঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসে। অনেকে এই চালের সাথে দুধ, চিনি বা নারিকেল মিশিয়ে আরও সুস্বাদু করেন।

কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা পিন্টু ও প্রনীত দেবনাথ বলেন, “আসলে আগের মতো এই বাঁশ এখন আর সচরাচর পাওয়া যায় না। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে পরিবার থেকে বলা হয়েছিল চুঙ্গাপুড়া খাওয়ার কথা। কয়েকটা বাজার ঘুরে মুন্সীবাজারে অল্প কিছু বাঁশ পেয়েছি, তা-ই নিয়ে যাচ্ছি।”

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, “সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম এই চুঙ্গাপুড়া পিঠা। এটি কেবল একটি খাবার নয়, আমাদের সংস্কৃতির অংশ। ঢলু বাঁশের সংকট আর নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে এটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।”

প্রবীণদের মতে, একসময় সিলেটের বাড়িতে মেহমান আসলে চুঙ্গাপুড়া পিঠা ও মাছ বিরাণ দিয়ে আপ্যায়ন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ সেই উৎসব আর মেঠোপথ থেকে খড় পোড়ানোর গন্ধ—সবই যেন ইতিহাস হতে চলেছে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর