Image description

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘রোগী কল্যাণ কমিটি’র বরাদ্দ নিয়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অসহায় রোগীদের সেবায় আসা লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো সুবিধাই পাননি দরিদ্র রোগীরা। এমনকি মৃত ব্যক্তি ও পলাতক রাজনৈতিক নেতার ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে সভার কার্যবিবরণী তৈরির মতো গুরুতর জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে ২৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে হিসাব খুলে কার্যক্রম শুরু হয়। তালিকায় থাকা অনেক জনপ্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হলেও তাদের নামে নিয়মিত স্বাক্ষর জাল করা হচ্ছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, কমিটির সদস্য ও সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব উল ইসলাম আলমগীর ২০১২ সালে মারা গেলেও কমিটির সভার খাতায় নিয়মিত তার স্বাক্ষর পাওয়া যাচ্ছে। কমিটির আরেক সদস্য এস এম জ্যাকিতুল্লাহ সরদার একজন মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও নথিতে তার বাবার নাম হিসেবে জনৈক ‘জগন্নাথ মন্ডল’ নামে এক হিন্দু ব্যক্তির নাম লেখা হয়েছে।

কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, “গত ৮ বছরে আমরা কোনো সভার চিঠি পাইনি। মাহবুব চাচা ২০১২ সালে মারা গেছেন, তিনি কবরে থেকে এসে কীভাবে স্বাক্ষর করলেন? এটি পরিষ্কার জালিয়াতি। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।” এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পলাতক থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু খালেদ বুলুর উপস্থিতিও নথিতে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ব্যাংক স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১৩ বছরে প্রায় ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে ১ লাখ এবং ২০২৫ সালের মে মাসে ৯০ হাজার টাকা জমা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু সমাজসেবা অফিসে এই বিপুল অর্থের ব্যয়ের কোনো সঠিক তথ্য নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা জানান, সমাজসেবা অফিস থেকে গত অর্থ বছরে ৫২ হাজার টাকার কিছু স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছিল। এর বাইরে কোনো রোগী আর্থিক সহায়তা পেয়েছে কি না, তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জানা নেই। 

কদমগাছী গ্রামের গৃহবধূ সুলতানা ও সদর ইউনিয়নের বৃদ্ধা আলেফা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “সমাজসেবা অফিস থেকে রোগীদের ওষুধ বা খরচ দেওয়া হয়, তা আমরা কোনোদিন শুনিনি। আমাদের মতো গরিবরা কোনো সাহায্যই পায় না।”

এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন বলেন, “আমি গত মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। আগের বিষয়গুলো আমার জানা নেই।”

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ নিয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহল ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, রোগীদের চিকিৎসার টাকা লুটপাট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অবিলম্বে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি না দিলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেবেন তারা।

মানবকণ্ঠ/ডিআর