Image description

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনা নদীতে তীব্র নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। নদীর পানি কমে গিয়ে বিশাল বালুচরের সৃষ্টি হওয়ায় দুর্গম চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ঘোড়ারগাড়ি। এতে অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে কৃষকদের, ফলে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ। এই পরিস্থিতিতে চরাঞ্চলে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকেই যমুনা নদীতে নাব্য সংকট শুরু হয়েছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে নদীর পানি একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং পরিস্থিতি দিনদিন আরও প্রকট হচ্ছে। ফলে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের সম্পূর্ণ এবং আরও ২টি ইউনিয়নের আংশিক এলাকায় ধু-ধু বালুচরের সৃষ্টি হয়েছে। এসব বালুচরে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল সম্ভব না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।

সম্প্রতি যমুনার চরাঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বালুচরের মধ্যে সারি সারি মালবাহী ঘোড়ারগাড়ি চলাচল করছে। কৃষকেরা এসব ঘোড়ারগাড়িতে করে উচ্চ ভাড়া দিয়ে তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। শুধু ফসল পরিবহনই নয়, জমিতে সার ও কীটনাশক নিতেও এখন ঘোড়ারগাড়ির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এতে একদিকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারজাত করতেও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে কাজিপুরের চরাঞ্চলে ভুট্টা, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, পেঁয়াজসহ প্রায় হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় নৌপথে পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব ফসল ঘোড়ারগাড়ি দিয়েই বহন করতে হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, মাত্র ২ থেকে ৪ কিলোমিটার পথ ঘোড়ারগাড়িতে এক বস্তা মরিচ পরিবহন করতে তাদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এরপর নদীপাড়ে পৌঁছে সেই ফসল আবার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে বাজারে নিতে হয়, সেখানেও বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে।

তেকানী ইউনিয়নের চর কান্তনগর এলাকার কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, “এ বছর চার বিঘা জমিতে মরিচসহ প্রায় সাত বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেছি। চরাঞ্চলে এখন প্রচুর ভুট্টা ও সবজি উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় নৌকায় ফসল পরিবহন করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ঘোড়ারগাড়িতে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে ফসল নিয়ে যেতে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “মাত্র কয়েক কিলোমিটার রাস্তার জন্য এক বস্তা মরিচে ১০০-১৫০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। পরে আবার অটোরিকশায় করে বাজারে নিতে হচ্ছে। এখন মরিচের দাম ভালো থাকায় কিছুটা লাভ হচ্ছে, না হলে বড় ধরনের লোকসান হতো।”

চরবাসীরা মনে করেন, বালুচরের ওপর বিশেষ ধরনের সড়ক নির্মাণ করা হলে সেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন খরচ কমবে এবং বাজারে সবজির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।

এ বিষয়ে কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যমুনার চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়টি উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় আলোচনা হয়েছে। চরাঞ্চলের মধ্যে কানেকটিভিটি সড়ক নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।”

যমুনার নাব্য সংকটে যখন নদীপথ প্রায় অচল, তখন চরাঞ্চলের কৃষকদের কাঁধে বাড়তি পরিবহন ব্যয় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে কৃষি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।