Image description

শরীয়তপুরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। টানা দুই দিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ থাকার পর সীমিত পরিসরে কিছু পাম্পে তেল বিক্রি শুরু হলেও স্বাভাবিক হয়নি সরবরাহ ব্যবস্থা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পদ্মা নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হাজারো জেলে।

জানা গেছে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার জেলার সব পেট্রোল পাম্প কার্যক্রম স্থগিত রাখে। শুক্রবার অল্প পরিমাণ তেল সরবরাহ পাওয়ার পর ৬টির মধ্যে ৩টি পাম্পে সীমিত আকারে বিক্রি শুরু হয়। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, গণপরিবহন, কৃষক ও জেলেদের জন্য নির্ধারিত সীমায় তেল দেওয়া হলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভোগান্তি কমেনি। তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু পরিমাণ তেল প্রভাবশালী ও ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষণ করতে হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

ডিজেল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পদ্মা নদীর জেলেদের ওপর। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, শরীয়তপুরে প্রায় ৩৩ হাজার জেলে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা-ট্রলার রয়েছে, যেগুলোর বড় একটি অংশ নিয়মিত পদ্মায় মাছ শিকার করে। এসব নৌযানের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জেলেরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম তেল পাচ্ছেন।

নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ নৌকা নদীর তীরে নোঙর করা। জেলেরা নদীতে যেতে না পেরে অলস সময় পার করছেন—কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ নৌকা সংস্কার করছেন, আবার কেউ অবসর কাটাচ্ছেন নানা উপায়ে।

জেলেরা জানান, আগে দিনে ৭-৮ ঘণ্টা মাছ ধরলেও বর্তমানে তেলের অভাবে ২-৩ ঘণ্টার বেশি নদীতে থাকতে পারছেন না। অনেকেই পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় একেবারেই নদীতে নামতে পারছেন না।

গোসাইরহাট উপজেলার জেলে আবু সুফিয়ান বলেন, “কয়েকদিন ধরে তেল না পাওয়ায় মাছ ধরতে যেতে পারছি না। অল্প তেলে নদীতে নামা সম্ভব নয়। এতে আয় বন্ধ হয়ে গেছে, সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”

প্রবীণ জেলে সিরাজুল ঢালী জানান, “খুচরা বাজারে তেল মিললেও লিটারে অতিরিক্ত দাম দিতে হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় মাছ ধরার সময়ও কমে গেছে।”

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেল মজুদ ও সিন্ডিকেট প্রতিরোধে খুচরা বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। তবে এতে জেলেদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, “খুচরা বাজারে তেলের সংকট থাকায় জেলেরা প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে মাছ ধরার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।”

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানান, “তেল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে জেলেরা জেলে কার্ডের মাধ্যমে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে পারবেন।”

জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শরীয়তপুরের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।