নাব্যতা সংকটে বিপর্যস্ত ব্রহ্মপুত্র: বন্ধ চিলমারী–রৌমারী ফেরি সার্ভিস
ব্রহ্মপুত্র নদ-এ পানি কমে তীব্র নাব্যতা সংকট দেখা দেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে চিলমারী-রৌমারী ফেরি সার্ভিস। ফলে দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন সময় লাগছে প্রায় চার ঘণ্টা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী, জেলে ও সাধারণ মানুষ; পাশাপাশি বেড়েছে যাতায়াত ব্যয়।
নৌপথে সময় কম লাগায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার যাত্রীরা চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর নৌরুট বেছে নিতেন। কিন্তু বর্তমানে নাব্যতা সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে ছোট নৌকা চললেও সেগুলো ধীরগতির হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। প্রতিদিন ঘাটে এসে যাত্রীরা ফেরি চালুর আশায় অপেক্ষা করলেও বেশিরভাগ দিনই কোনো সুখবর মিলছে না।
উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চালু করা হয় এই ফেরি সার্ভিস। তবে নাব্যতা সংকটের কারণে গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে এটি বন্ধ রয়েছে। এতে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার মানুষকে দীর্ঘ ঘুরপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফেরি চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৯২৮ দিনের মধ্যে ৫২০ দিনই এই সার্ভিস বন্ধ ছিল। এতে একদিকে যাত্রী ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। লোকসানে পড়ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন।
এদিকে, নাব্যতা সংকটের কারণে চিলমারী নৌ-বন্দরের সাথে যোগাযোগের ৬টি রুটের মধ্যে প্রায় চার মাস ধরে ৩টিই বন্ধ ছিলো। তবে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজিবপুর ও কোদালকাটি রুটে নতুন করে নৌকা চলতে শুরু করলেও এখনো বন্ধ কর্তৃমারীর রুটে নৌ-চলাচল। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা, ডুবোচর সৃষ্টি এবং উজানের ভাঙনের ফলে দ্রুত নাব্যতা কমে যাচ্ছে। ফলে নিয়মিত ড্রেজিং করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
নৌকাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, “নদীতে পানি কম থাকায় নির্দিষ্ট চ্যানেল ধরে ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগছে এবং তেলের খরচ বেড়েছে। তেলের সংকটের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে, ফলে আমরা লোকসানে পড়ছি।”
ঢাকা থেকে আসা গার্মেন্টসকর্মী মহসীন আলী বলেন, “আগে রাজিবপুর থেকে চিলমারী সরাসরি যাতায়াত করতাম। নাব্যতা সংকটে এখন ঘাট বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে রৌমারী দিয়ে ঘুরে আসতে হচ্ছে- এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে।”
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর ড্রেজিং বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান জানান, চিলমারী–রৌমারী ফেরিপথ প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেশের অন্যতম বড় ফেরিপথ। এখানে সারাবছর ড্রেজিং প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সীমিত পরিসরে কাজ চলছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজিং কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই; বরং এ খাতে অনিয়ম ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে।
চিলমারী নৌবন্দর ঘাটের ইজারাদার আনোয়ার হোসেন বলেন, “নাব্যতা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রুটে নৌকা চলাচল বন্ধ। চ্যানেল তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আমাদের মূলধন ঝুঁকির মুখে।”
চিলমারী নৌবন্দর পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র রায় বলেন, “নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া ফেরি চালুর সম্ভাবনা কম। এত বড় পরিসরে ড্রেজিং করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
নাব্যতা সংকটে নদীতে প্রতিদিন জেগে উঠছে নতুন নতুন বালুচর। এতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় ১,৪৫২ জন মৎস্যজীবী সরাসরি নদীর ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের জীবিকায় বড় প্রভাব পড়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান খান বলেন, “মা ইলিশ সংরক্ষণ মৌসুমে কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও বছরের অন্য সময়ে জেলেদের জন্য তেমন কোনো কার্যকর সহায়তা নেই।”
জেলে ফুলেল মাঝি বলেন, “নদীতে পানি নেই, মাছও কম। আয় না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।” অন্যদিকে, জেগে ওঠা বালুচর নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃষকদের জন্য। বিস্তীর্ণ এলাকায় ভুট্টা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে।
চিলমারীর অষ্টমীরচরের কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, “ফলন ভালো হলেও নদীতে পানি না থাকায় পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে গেছে দ্বিগুন।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর ড্রেজিং ও স্থায়ী নাব্যতা নিশ্চিত করা না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট একসময় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে জেলে ও নৌ-নির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণেরও জোর দাবি উঠেছে।




Comments