Image description

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বঞ্চনা ও অবহেলার বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাননি যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার বেগম। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার আদাঐর ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের এই নারী গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগমের কন্যা। যিনি একাত্তরের নির্মমতার সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালেও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তার নিজের জীবনই চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনাহারে কাটছে।

জন্মপরিচয়ের কারণে শৈশব থেকেই সমাজের ঘৃণা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন শামসুন্নাহার। যুদ্ধশিশু পরিচয়ের অপবাদে কেউ তাকে বিয়ে করেনি। ফলে নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য আর সামাজিক অবমাননা তার জীবনের স্থায়ী অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি মনোদৈহিক সমস্যার পাশাপাশি গলায় জটিল রোগে আক্রান্ত। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

শামসুন্নাহারের জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় শুরু হয় গত বছরের ডিসেম্বরে। পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক চাপের মুখে সৎ ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে মারধরের শিকার হয়ে নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন তিনি। এরপর থেকে মনতলা রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন একটি মন্দিরের পাশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক সময় দিনের পর দিন তাকে অনাহারেই কাটাতে হচ্ছে।

শামসুন্নাহার বেগম জানান, তিনি একাধিকবার উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু দফতরে দফতরে ঘুরেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেও কোনো সহযোগিতা মেলেনি।

আক্ষেপ প্রকাশ করে শামসুন্নাহার বলেন, “দেশের জন্য আমার মা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমি জন্ম থেকে অভিশাপ মাথায় নিয়ে চলছি। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি। বাড়ি ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। আমি এখন ঘরহীন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।”

স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী বিশ্বজিৎ পাল বলেন, “যুদ্ধ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শামসুন্নাহারের জীবনযুদ্ধ আজও থামেনি। একজন যুদ্ধশিশু ও বীরাঙ্গনার সন্তান অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় মন্দিরের পাশে পড়ে থাকবে—এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত তাকে পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করা এই দেশে শামসুন্নাহারের মতো যুদ্ধশিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

মানবকণ্ঠ/ডিআর