Image description

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় এনজিও ঋণের কিস্তির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কয়েকশ পরিবার। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ, কেউবা ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছেন এলাকা থেকে। একটি কিস্তি শোধ করতে অন্য এনজিও থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়ার এই ‘চক্র’ এখন উপজেলার সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঋণের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। পিরোজপুর এলাকার বাসিন্দা আঙ্গুরা বেগম ৩ বছর আগে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে ব্যবসা করতে দিয়েছিলেন। ছেলের নেশাগ্রস্ততায় সেই ব্যবসা লাটে উঠলেও থামেনি ঋণের চাকা। বর্তমানে চারটি এনজিও ও সমিতি থেকে তাঁর মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। আঙ্গুরা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "একটা ঋণ শোধ করতে আরেকটা নিতে হয়। এই ঋণের হিসাবের আর শেষ নেই।"

ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে গত কয়েক মাসে উপজেলায় একাধিক আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। বনকিশোর এলাকার মিঠুন দাস ৫ লাখ টাকার ঋণের চাপ সইতে না পেরে ফেসবুক লাইভে এসে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। একইভাবে একাধিক ঋণের চাপে আত্মহত্যা করেন পঁওরা এলাকার মাছচাষি আব্দুল কুদ্দুস। মিঠুন দাসের মৃত্যুর পরও রেহাই পাচ্ছে না তাঁর পরিবার। তাঁর মা শ্রীমতি রানী জানান, ছেলে মারা গেলেও এনজিও কর্মীরা কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে তিনি এখন বাড়িছাড়া।

শুধু আত্মহত্যাই নয়, ঋণের চাপে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। মুংলি গ্রামের সেলিম হোসেন পরিবারসহ প্রায় এক বছর আগে এলাকা ছেড়েছেন। বাবার ঋণের কারণে তাঁর ছেলের এসএসসি পরীক্ষাও দেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলে বেশিরভাগ ঋণ নারীদের নামে নেওয়া হলেও সেই অর্থ ব্যবহার করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ফলে ঋণের চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ে নারীর ওপর। এলাকায় সরকারি নিবন্ধিত ২৩টি এনজিও ছাড়াও নামে-বেনামে আরও অর্ধশত সংস্থা ও সমিতি সক্রিয় রয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ‘রুলফাও’-এর পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, "যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ায় একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে সংকটে পড়ছেন।" ইএসডিও চারঘাট শাখার ব্যবস্থাপক শাহ আলম বলেন, "অনেকে তথ্য গোপন করে একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হলে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।" তবে মাঠ পর্যায়ে এনজিও কর্মীদের টার্গেট পূরণের প্রতিযোগিতাও এই সংকটের একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এনজিও ঋণের কিস্তি আদায় ও ঋণ বিতরণে কঠোর তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের এই ‘কিস্তির মরণফাঁদ’ থেকে মুক্তি মিলবে না।

মানবকণ্ঠ/ডিআর