Image description

বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওর পাড়ের কৃষকরা বছরের একমাত্র ফসল হারানোর শঙ্কায় তারা আহাজারি করছেন। বলছিলাম ভাটির রাজাধানী খ্যাত সুনামগঞ্জের হাওরর পারের কৃষকদের কথা। উদ্বৃত খাদ্য শস্যে উদ্বৃত্ত এ জেলার কৃষকরা এ বছর বছরের খোরাকি গোলায় তোলা নিয়ে শঙ্কিত। একদিকে, শ্রমিক সংকট, অপরদিকে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভারীবৃষ্টিপাত থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতে আশঙ্কা কৃষকদের শঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

জেলার ১২টি উপজেলায় সাড়ে ৮শত হারভেস্টার ধান কাটছে বলে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দাবি করলেও কৃষকরা বলছেন হারভেস্টার পানিতে নেমে ধান কাটতে পারেন। 

কৃষকরা আরও জানান, জেলার দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর,ধর্মপাশা ও তাহিরপুরে বিশাল বিশাল হাওরের পাকা ও আধাপাকা ধান এখন বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। এসব বিশাল হাওরে নৌকা দিয়ে ধান কাটা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১২ টি উপজেলার  ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এবার জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। যার উৎপান লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৩ হাজার ৭২৪ মেট্রিকটন ধান। যার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। 

সূত্র আরও জানান, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় জেলায়  শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বললেও হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। 

এদিকে, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ফসল রক্ষায় এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলার বড় ৫৩টি হাওরের ৬০৩ কিলোমিটার বেরীবাঁধে ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করছে। এসব বাঁধ নির্মনে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও বরাদ্দ এসেছে ৬৭ কোটি টাকা।

জানাগেছে, পাম্প বসিয়ে হাওরের পানি নিষ্কাশনে জেলার বিভিন্ন হাওরে অন্তত ৪শত পাম্পা বসিয়ে জলাবদ্ধতার পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করলেও কয়েক দিনের টানা বর্ষনে হাওরে জলাবদ্ধা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। ধানা কাটা শুরু হলেও টানা বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি লেগে থাকা ধান কাটার মেশিন হারভেস্টার এবার ধান কাটতে ভূমিকা রাখতে পারছে ন। জমিতে হারভেস্টারের চাকা ধেবে যাওয়ার কারণে কৃষকরা পড়েছেন মহা বিপদে। কৃষি যান্ত্রিকরণে নির্ভর করার ফলে কৃষকরা ধান কাটার শ্রমিক সংকটে ভোগছেন।

এদিকে, কোন কোন কৃষক কিছু পরিমান জমির ধান কাটলেও টানা বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা ধান শোকাতে না পারায় নতুন ধানে ধান বীজে অঙ্কুরিত হচ্ছে।

জেলার দিরাই উপজেলার ধল গ্রামের সম্ভ্রান্ত কৃষক আনাছুর রহমান মানবকণ্ঠকে জানান, এবার তিনি গ্রামের পার্শ্ববর্তী বরাম হাওরে ৫০ কেদার (৩০ শতকে এক কেদার) জমি চাষাবাদ করেছেন। বর্তমানে ধান পেকে গেলেও শ্রমিক সংকটের কারণে মাত্র ১৫ কেদার জমির ধান কেটেছেন। বাকি ৩৫ কেদার পাকা ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার যে ধান কেটেছেন তা মাড়াই দেয়া হলেও টানা বৃষ্টিত কারণে শোকাতে না পারায় ধানে বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।

একই উপজেলার চাপতির হাওরপাড়ের কলিয়ার কাপন গ্রামের সম্ভ্রন্ত কৃষক ফটিক মিয়া চৌধুরী মানবকণ্ঠকে জানান, চাপতির হাওরের চারভাগে তিনভাগ জমির আধাপাকা ধান বৃষ্টির পানিতে ডুবেগেছে। তিনি আরও জানান, অন্যান্য বছর হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা গেলেও এবার পানিতে হারভেস্টার চলছে না। তবে কেউ কেউ কিছু ধান কাটলেও টানা বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারায় মাড়াই করা ধানে বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে। 

একই উপজেলার বড়কাপন গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন মানবকণ্ঠকে জানান তিনি যে কয়েক কেদার বোরো জমি চাষাবাদ করেছিলেন তার সবকুটুই এখন বৃষ্টির পানি নীচে। এখন তার আহাজারি করা ছাড়া কোন উপায় নেই।

তাহিরপুর উপজেলার গৌবিন্দশ্রী গ্রামের সম্ভ্রান্ত কৃষক সেলিম আখঞ্জি মানবকণ্ঠকে জানান, গ্রামের পার্শ্ববর্তী শনি হাওরে এবার তিনি অন্তত ৩৫ দেকার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। সপ্তাহ খানে আগে ১০ কেদার জমির ধানা কেটে মাড়াই করেছেন। বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত শুকাতে পারেন নি। আগামী ২/৩ দিনে মধ্যে রোদ না পেলে প্রায় একশত মণ ধান খলায় পড়ে নষ্ট হবে। 

তিনি আরও বলেন , অন্তত ২৫ কেদার ধান বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধায় ডুবে যাচ্ছে।

একই উপজেলার মাটিয়ান হাওর পারের কৃষক তৈমুর রেজা তালুকদার মানবকণ্ঠকে জানান, ৪০ কেদার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। হাওরের জাঙ্গালের বেহাল দশা ও জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা যাচ্ছে না এবং ধান কাটার শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি দিয়ে ২৫ কেদার ধান কেটে খলায় তুলেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় তা শুকাতে পারছেন না। বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়ে গেছে।

একই উপজেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক আমিন মানবকণ্ঠকে জানান, তার প্রায় ৩০ কেদার জমির পাকা ধান তিন দিন আগেই কাটার উপযুক্ত হয়েছে। শ্রমিক সংকটের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান জমিতেই নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত আবহাওয়া অনুকূলে না এলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাকে।

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ মানবকণ্ঠকে গত ৮ থেকে ১০ বছরে ধানা কাটার মেশিন দিয়ে ধান কেটে কৃষকরা অভ্যস্থ হয়ে পড়ায় ধান কাটা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছিলেন। তবে, এবার অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে জলাবদ্ধতা লেগে যাওয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকটে ভোগছেন কৃষকরা।

সামগ্রিকভাবে জেলায় ৪৭ শতাংশ ধানা কাটা হয়েছে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানকে উড়িয়ে দিয়ে রাজু আহমেদ মানবকণ্ঠকে আরও জানান, জেলায় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বোরো কাটা হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে কাটা ধান মাড়াই ও শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। 

তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের নৌকা দিয়ে অথবা আনসার ভিডিপি দিয়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। 

সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শাহ মোহাম্মদ সজিব হোসেন মানবকণ্ঠকে জানান, আগামী ৩ মে পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার মানবকণ্ঠকে জানান, এ বছর জেলার ৫৩ হাওরের ৭১৮টি পিআইসির মাধ্যমে ৬০৩ কিলোমিটার বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর বেরীবাধ নির্মাণে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্ধ পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে মামুন হাওলাদার  আরও জানান, আগামী ৩ মে পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কৃষকদের দ্রুত ধানা কাটা পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সুরাম নদীর সুনামগঞ্জ ষোঘর পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার ১ দশমিক ৬৯ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল হাওরে বাঁধ ভেঙ্গে ও  একই উপজেলার জিনারিয়ার বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে পানি ঢুকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডে এই কর্মকর্তা বাঁধ দু’টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নয়।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক মানবকণ্ঠকে জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে প্রতিটি উপজেলার হাওরের নীচু জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫০ শতাংশ মানে ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর জমি কাটা হয়েছে।

তিনি জানান, জেলায় সাড়ে ৮শত হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে। তবে, জমিতে পানি জমে থাকায় ও বৃষ্টিপাতের কারণে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে কিছুটা প্রতিবন্ধতকা দেখা দিয়েছে।