কাপ্তাইয়ের সিতা পাহাড়ে ৫ বছর ধরে বন্ধ একমাত্র বিদ্যালয়, নেই সুপেয় পানি
পাহাড়ের বুক চিরে প্রতিদিন সূর্য উদিত হলেও রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অতি দুর্গম নারানগিরি সিতা পাহাড় এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছানোর আগেই যেন সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এই জনপদে শতাধিক মারমা পরিবারের শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তায়। কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্ব হলেও এখানে নেই কোনো যানবাহন চলাচলের পথ, নেই সুপেয় পানির নূন্যতম নিশ্চয়তা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উঁচু-নিচু পাহাড় আর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এই এলাকা থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ‘পায়ে হাঁটা’। যাতায়াতের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কোমলমতি শিশুদের পক্ষে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে শিক্ষা গ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী ও চরম অসচ্ছল হওয়ায় সন্তানদের দূরে পাঠিয়ে পড়াশোনা করানো তাদের কাছে এখন বিলাসিতা মাত্র।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে 'সংগ্রাম' নামক একটি এনজিও এই দুর্গম এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। দীর্ঘ সময় জেলা পরিষদের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে স্কুলটি সচল ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৫ বছর আগে স্কুলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে জীর্ণ ও পরিত্যক্ত বেড়ার ঘরটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। শিক্ষকরাও স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আর এলাকায় ফেরেননি।
এমন দুঃসময়ে আশার প্রদীপ হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় দুই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী— অংসাচিং মারমা ও সাইনুচিং মারমা। জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেই স্কুল ঘরেই নিজেদের উদ্যোগে শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কোনো বেতন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ছাড়াই কেবল শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই অসাধ্য সাধন করছেন তারা। তাদের মতে, "প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া আমাদের জনপদের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই শত কষ্টের মাঝেও আমরা হাল ছাড়িনি।"
শিক্ষার অভাবের পাশাপাশি এই এলাকায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঝরনা বা ছড়া শুকিয়ে গেলে পানির জন্য হাহাকার পড়ে যায়। আবার বর্ষাকালে বাধ্য হয়ে পান করতে হয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঘোলা ও ময়লা পানি। ফলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
সিতা পাহাড় এলাকার কার্বারি পাইচিংমং মারমা ও স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ক্যথোয়াই অং মারমা আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া আমাদের স্বপ্নটা আজ ধ্বংসস্তূপ। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—এখানে একটি স্থায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং পানীয় জলের সুব্যবস্থা করে এই অবহেলিত মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা হোক।"
এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, "শারীরিক অসুস্থতার কারণে অতি দুর্গম ওই পথ পাড়ি দিয়ে এলাকাটি পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে দেখছি। শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, "সিতা পাহাড় এলাকাটি নিকটস্থ সরকারি স্কুল থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে। আমি ইতোমধ্যে এলাকাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি নতুন স্কুলের প্রস্তাবনা পাঠিয়ে রেখেছি।"
প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে সিতা পাহাড়ের শিশুদের কলকাকলিতে পুনরায় মুখরিত হবে কোনো নতুন বিদ্যালয়—এমনই প্রত্যাশা দুর্গম পাহাড়ের এই সুবিধাবঞ্চিত জনপদের।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments