Image description

নড়াইলের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক সময়ের শান্ত-স্নিগ্ধ চিত্রা নদী এখন দখল আর দূষণে মৃতপ্রায়। প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলের মহোৎসব, নর্দমার বর্জ্য ও প্লাস্টিকের দূষণে বিষিয়ে উঠছে নদীর পানি। জেলা প্রশাসন ৬৩ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করলেও রহস্যজনক কারণে বছরের পর বছর ধরে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নড়াইল শহরের পুরাতন টার্মিনাল, মাছিমদিয়া এবং রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা। নদী ভরাট করে কোথাও দোকানপাট, কোথাও ঘরবাড়ি, আবার কোথাও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিন যেতে না যেতেই দখলদাররা আবারও ফিরে আসে। মূলত নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত না হওয়ায় দখলের এই প্রক্রিয়া থামানো যাচ্ছে না।

দখলের পাশাপাশি চিত্রা নদীর বর্তমান প্রধান সমস্যা তীব্র দূষণ। শহরের অধিকাংশ ড্রেনের সংযোগ সরাসরি নদীতে দেওয়া হয়েছে। রূপগঞ্জ বাজারের কসাইখানা ও মাছ বাজারের যাবতীয় বর্জ্য প্রতিদিন মিশছে এই পানিতে। এছাড়া পলিথিন, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য এবং ক্লিনিক্যাল বর্জ্য প্রতিনিয়ত ফেলার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দূষিত পানির উৎকট গন্ধে নদীর পাড় দিয়ে চলাচল করা এখন সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে পড়েছে।

এক সময় চিত্রা নদীতে প্রচুর দেশি মাছ ও বিলুপ্তপ্রায় শুশুকের দেখা মিললেও এখন তা ইতিহাস। দূষণের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে গেছে এবং শুশুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় পাড়ের বাসিন্দারা চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী হাফিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চিত্রা নদীকে রক্ষার আন্দোলন করছি। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু দখলদারদের উচ্ছেদে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। প্রশাসন মুখে বললেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।"

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে কমপক্ষে ৬৩ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি নদী দখল করে রেখেছেন। তালিকাভুক্ত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসনে আরি তান্নি বলেন, "চিত্রা নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা নতুন করে কাজ শুরু করেছি। তালিকার ভিত্তিতে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া যারা নদী দূষণের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নড়াইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক চিত্রা নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু উচ্ছেদ নয়, নদীর দ্রুত ড্রেজিং এবং বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে দূষণমুক্ত করা জরুরি।

মানবকণ্ঠ/ডিআর