Image description

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমে আসার প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। এটি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এবং গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের প্রথম মুদ্রানীতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় প্রধান নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) হারেও কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না।

মাঝে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপ বেড়েছে। এর প্রভাবে গত মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, স্বল্প সময়ে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা নেই। এ কারণেই সুদহার কমানোর পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এসেছে তারা।

গত ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, অথচ গত এপ্রিল পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার ১১ শতাংশের বেশি হওয়ায় প্রকৃত অর্থে ঋণের চাহিদা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিপরীতে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, ফলে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ মাস পর আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে এবং ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার কাছাকাছি স্থিতিশীল রয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে রাখার নীতির কথা তুলে ধরা হতে পারে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়াতে কম সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ, প্রবাসীদের জন্য রূপান্তরযোগ্য টাকা অ্যাকাউন্ট চালুর উদ্যোগ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবারও কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনাও নতুন মুদ্রনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।