বড় বড় কোম্পানিগুলো মোটা অংকের ঋণ নিয়ে খেলাপি হলে এখন আর তেমন চিন্তা করতে হয় না। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আর নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের জোড় থাকলেই খুব সহজেই ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব সুযোগ ব্যাংকগুলোকে অনেকটা গণহারেই দিচ্ছে। এটাই এখন ব্যাংক খাতের জন্য বড় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে রাজনৈতিক পরিচয় দেখে সুযোগ দিতো। এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান। যে কোম্পানির কর্মসংস্থান বেশি তার খেলাপি ঋণের সুযোগও বেশি। অর্থাত্ তাদের যদি খেলাপি থাকে তাহলে নীতি সহয়তা তার পক্ষে যাবে। ঋণ নিয়ে না দেয়ার কারণে সমাজে একটি কুিসত ক্রেডিট কালচার তৈরি হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করা যেমন বোকাদের কাজ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতে ঋণ পুনঃতফসিল করার হার এখন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১ সালে যেখানে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, ২০২৫ সাল শেষে তা এক লাফে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বার্ষিক ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে ৯৯ শতাংশ বা প্রায় দ্বিগুণ। সেই প্রতিবেদনে তথ্য বলছেন, ১০টি ব্যাংকের কাছেই পুরো খাতের ৫৭.০৪ শতাংশ পুনঃতফসিল করা ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।
পুনঃতফসিলের এই বিশাল সুবিধার সিংহভাগই ভোগ করছে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়া পুনঃতফসিল করা ঋণের ৭২.৩৮ শতাংশই বড় শিল্পের দখলে। অথচ দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মাইক্রো ও কটেজ শিল্প পেয়েছে মাত্র ১.৬০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র শিল্প পেয়েছে ৬.৭৬ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বকেয়া পুনঃতফসিল করা ঋণের ৭৪.১৬ শতাংশই রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঝুঁলিতে। আরও ভীতিজনক তথ্য হলো, মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছেই পুরো খাতের ৫৭.০৪ শতাংশ পুনঃতফসিল করা ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের মাস্টার সার্কুলার জারি করে ডাউন পেমেন্টের (এককালীন জমা) হার সর্বনিম্ন এবং পরিশোধের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়, তখন থেকেই এই খাতের শৃঙ্খলা ভাঙতে শুরু করে। ২০২৫ সালে দেশের ব্যবসায়িক মন্দা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরিস্থিতিতে গঠিত ‘হাই-পাওয়ার্ড কমিটি’র বিশেষ ছাড়ের পর ব্যাংকগুলো ঢালাওভাবে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা শুরু করে, যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে আজ খাতের মোট বকেয়া ঋণের ২৪.৫৪ শতাংশই (প্রায় এক-চতুর্থাংশ) পুনঃতফসিল করা ঋণের খাতায় চলে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর ব্রাঞ্চ লেভেলে মার্কেটিং এবং রিলেশনশিপ শতভাগ বাস্তবায়িত হয় না। ফলে ঋণ দেয়ার পর ফান্ডের অপব্যবহার বা ডাইভারশন রোধে ব্যাংকগুলো দুর্বল মনিটরিংয়ের পরিচয় দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ঋণখেলাপি ও পুনঃতফসিলের হার বাড়িয়ে দেয়। তাত্ত্বিকভাবে মনে করা হয়, পুনঃতফসিল হলো একজন গ্রাহককে ব্যবসায় ফেরার দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে পুনঃতফসিল করা ঋণের ৩৯.৮৭ শতাংশই (১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা) ইতোমধ্যে পুনরায় খেলাপি হয়ে গেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের শীর্ষপর্যায়ে থাকা ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণের বিষয়ে নীতি সহায়তা দেয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এভাবে একটি কিছু সংখ্যক বড় গ্রুপকে ঋণের সুযোগ সুবিধা দিয়ে যে দেশের অর্থনীতি ভালো হবে তা নয়। সব শ্রেণির ব্যবসায়ীদের সমান সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় ব্যবসায়ী অঙ্গণে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। এতে করে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ঝড়ে যেতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করেছেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে পুনঃতফসিল এত বেশি হওয়ার মূল কারণ হলো এ দেশের উচ্চ খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার, যা প্রায় ৩০ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে তাদের ব্যালেন্স শিট কিছুটা ক্লিয়ার করার সুযোগ দিতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা না হলে ব্যাংকগুলোকে এই বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) রাখতে হতো। আর ১০০ টাকার মধ্যে ৩০ টাকাই যদি প্রভিশনিংয়ে আটকে থাকে, তবে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেবে কীভাবে? এর ফলে বাজারে সুদের হারও অনেক বেড়ে যেত। তাই ব্যাংকিং খাতকে সচল রাখতেই বাংলাদেশে পুনঃতফসিলের হার এত বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, সরাসরি ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুবিধা দেয়ার জন্য কড়াকড়ি নেই— বিষয়টি এমন নয়। নীতিমালা অনুযায়ী ঋণখেলাপি না হওয়া পর্যন্ত তা পুনঃতফসিল করা যায় না। তবে অনেক সময় গ্রাহকরা দেখেন যে, তারা ঋণ রিস্ট্রাকচারিং বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে যে বাড়তি সময় পাচ্ছেন, তাতেও ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তখন তারা আরও বেশি সময় পাওয়ার আশায় ইচ্ছে করে নিজেদের খেলাপি বানান, যাতে পরে ব্যাংকারদের সঙ্গে এক ধরনের যোগসাজশ বা ডিউ ডিলিজেন্স অমান্য করে পুনঃতফসিল সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই সুবিধা দেয়া হচ্ছে, কারণ ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি বড় সংকটের (গর্তের) মধ্যে পড়েছে। এখান থেকে বের হওয়ার একটা পথ খোঁজা জরুরি। অতীতে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা মুখ দেখে পুনঃতফসিল করার নজির ছিল। তাই বর্তমানের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃতফসিলের শর্তগুলো খতিয়ে দেখা দরকার এবং মাঠ পর্যায়ে ব্যাংকাররা বা ব্যাংকের এমডিরা কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করছেন, তা জানা প্রয়োজন।
মূলত তিনটি উপায়ে পুনঃতফসিল সুবিধার এই অবাধ অপব্যবহারে দেশের ব্যাংক খাত সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে পড়েছে। চরম তারল্য সংকট, ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ঋণ না দেয়ার সংস্কৃতি বিস্তার। ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হওয়ার অর্থ হলো এই বিশাল অঙ্কের নগদ টাকা ব্যাংকে ফেরত আসেনি।
আবার ঋণ পুনঃতফসিল করলে প্রভিশন রাখার প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্যাংকগুলো সাময়িকভাবে কাগজে-কলমে মুনাফা দেখালেও বাস্তবে ভল্ট ফাঁকা। এর ফলে ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে গেছে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে।




Comments