দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণখেলাপিদের প্রতি প্রশ্রয় এবং সুশাসনের ঘাটতির একটি ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-খেলাপি ঋণের এই পাহাড় এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, প্রভাবশালী গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা, দুর্বল যাচাই-বাছাই এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব ব্যাংক খাতকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাওয়ায় সেই অঙ্ক আরও বেড়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি- খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি মানেই পুরো অর্থই নতুন করে লুট বা আত্মসাৎ হয়েছে, এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। ঋণের শ্রেণিকরণ, সুদ যুক্ত হওয়া এবং দীর্ঘদিনের গোপন দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার কারণেও হিসাবের অঙ্ক দ্রুত বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলছে, সুদ যুক্ত হওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে মূল সমস্যাটিকে আড়াল করার সুযোগ নেই। কারণ, ঋণের একটি বড় অংশ যদি বছরের পর বছর অনাদায়ী থাকে, তাহলে ব্যাংকের মূলধন, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তার চাপ পড়বেই।
বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের একীভ‚তকরণ এবং সেসব প্রতিষ্ঠানে ৮০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হওয়ার তথ্য ব্যাংক খাতের গভীর ক্ষতই প্রকাশ করে। প্রশ্ন হলো, এত বিপুল ঋণ কীভাবে দেয়া হলো? কারা ঋণ পেল? ঋণ দেয়ার সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কী ধরনের যাচাই করেছে? এবং দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করেও কীভাবে অনেক গ্রাহক বারবার নতুন সুবিধা পেয়েছেন?
খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া যেতে পারে, তবে পুনঃতফসিল যেন ঋণখেলাপিদের জন্য স্থায়ী আশ্রয়স্থল না হয়।
অতীতে বারবার পুনঃতফসিল ও বিশেষ ছাড়ের ফলে প্রকৃত খেলাপি আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে। তাই নতুন সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি প্রকৃত ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির পার্থক্য করতে হবে। এখন সবচেয়ে প্রয়োজন কঠোর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ঋণ আদায় ব্যবস্থা। বড় ঋণখেলাপিদের প্রকৃত সম্পদ শনাক্ত করে আইনানুগভাবে ঋণ আদায় করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা ক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো ছাড় দেয়া চলবে না। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি আমানতকারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সমস্যা। তাই অঙ্ক কম দেখানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। ব্যাংক খাতকে সুস্থ করতে এখন দরকার লোকদেখানো ছাড় নয়, প্রয়োজন সুশাসন, কঠোর নজরদারি এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা। নইলে খেলাপি ঋণের এই পাহাড় ভবিষ্যতে পুরো অর্থনীতির জন্য আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।




Comments