Image description

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান–এর মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পরিস্থিতিকে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, আফগানিস্তান পাকিস্তানের ‘ধৈর্যের সীমা অতিক্রম’ করেছে।

সংঘাতের সূচনা

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাকিস্তান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ নামে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সীমান্তপারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি বলেন, তাদের বিরোধ আফগান জনগণের সঙ্গে নয়; বরং সেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, যারা আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। জাতিসংঘের বিভিন্ন মনিটরিং প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে টিটিপির উপস্থিতি এবং আফগান তালেবান শাসনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের কথা উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা–র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, টিটিপি ছাড়াও জামাত-উর-আহরার ও হিজব-উল-আহরারের মতো গোষ্ঠীগুলো সীমান্তপারে সক্রিয় রয়েছে।

সামরিক বাস্তবতা ও পাল্টা হুঁশিয়ারি

পাকিস্তানের দাবি, বিমান হামলায় শতাধিক তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আফগান তালেবান প্রশাসন সীমান্ত শহরগুলোতে প্রতিশোধমূলক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

পাকিস্তানি দৈনিক ডন–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তালেবান যদি গেরিলা কৌশল ছেড়ে সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধে জড়ায়, তবে পাকিস্তানের বিমান শক্তি ও সামরিক সক্ষমতার সামনে তা আত্মঘাতী হতে পারে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশ্লেষক আব্দুল বাসিতের মতে, সামরিক ভারসাম্যে পিছিয়ে থাকায় আফগান তালেবান অপ্রচলিত কৌশল—যেমন আত্মঘাতী হামলা—ব্যবহার করতে পারে।

অন্যদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি টিটিপির উপস্থিতির অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বলে দাবি করেন।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক ভূমিকা

সংঘাত প্রশমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়েছে। কাতার ও সৌদি আরব অতীতে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি চীন, তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়া পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস–এর দপ্তর থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পর দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে বড় সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামনে কোন পথ?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাত তিনটি পথে এগোতে পারে—
১. সীমিত বিমান ও সীমান্ত হামলায় সীমাবদ্ধ থাকা,
২. পূর্ণাঙ্গ আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধে রূপ নেওয়া,
৩. আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান।

বিশ্লেষকদের অভিমত, সামরিক উত্তেজনা যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ঝুঁকি বাড়বে পুরো অঞ্চলের জন্য। ফলে অস্ত্রের বদলে আলোচনার টেবিলই এখন সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠছে।

মানবকণ্ঠ/আরআই