Image description

কঠোর নিরাপত্তা, নতুন সাজে সজ্জিত রাস্তাঘাট এবং চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক ঐতিহাসিক বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের অবসানের আশায় এই বৈঠকের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে পুরো বিশ্ব।

মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর যে ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা হয়, তার রেশ টানতেই এই যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংঘাতের জেরে তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও শর্তের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে শান্তি প্রক্রিয়া।

কারা থাকছেন আলোচনায়?: হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, শনিবার শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গী হিসেবে থাকছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।

অন্যদিকে, ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে উভয় পক্ষ আলাদা কক্ষে বসবে এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন।

বৈঠকের স্থান ও নিরাপত্তা: ইসলামাবাদের রেড জোনে অবস্থিত বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার হোটেলটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং সাধারণ অতিথিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির পাশাপাশি জরুরি সেবা বাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

কী থাকছে আলোচ্যসূচিতে?: বৈঠকের টেবিলে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা দাবির মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধের বিষয়টি রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জোর দিচ্ছে ইরান যেন তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দেয়, যাতে তেহরান এখনও সম্মতি দেয়নি।

তবে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'লেবানন ইস্যু'। ইসরায়েল লেবাননে ভয়াবহ হামলা অব্যাহত রাখায় ক্ষুব্ধ ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে তেহরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে। বিপরীতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতাভুক্ত নয়।

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান: উভয় দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখায় এই আলোচনার আদর্শ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। এছাড়াও নেপথ্যে থেকে দুই পক্ষের নেতাদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।

সম্ভাবনা ও অন্তরায়: বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থাকা গভীর আস্থার সংকটই এই শান্তি চুক্তির প্রধান বাধা। তাছাড়া যুদ্ধে সরাসরি জড়িত ইসরায়েলের এই আলোচনায় অনুপস্থিত থাকাও একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করে লেবাননে হামলা থামাতে পারবে কি না, তার ওপরই মূলত নির্ভর করছে এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের চূড়ান্ত সফলতা।

মানবকণ্ঠ/আরআই