হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি ও লেবানিজ রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আরও তিন সপ্তাহের জন্য বাড়ানো হয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি ও লেবানিজ রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়। তার মতে, আলোচনা ‘খুব ভালোভাবে’ সম্পন্ন হয়েছে।”
গত সপ্তাহ থেকে দুই দেশের মধ্যে চলমান উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার এটি ছিল দ্বিতীয় দফা। এর আগে গত শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া ১০ দিনের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি সোমবার শেষ হওয়ার কথা ছিল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প বলেন, হিজবুল্লাহর হাত থেকে আত্মরক্ষায় লেবাননকে সাহায্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন যে, তিনি “অদূর ভবিষ্যতে” ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লেবাননের রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাতের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন।
ট্রাম্প লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ এবং ইসরায়েলি প্রতিনিধি ইয়েহিয়েল লাইটারকে তাদের আগমনে স্বাগত জানান।
উপস্থিত অন্যান্য ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন, উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, পররাষ্ট্র দপ্তরের উপদেষ্টা মাইকেল নিডহ্যাম এবং ইসরায়েল ও লেবাননে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতগণ।
ওভাল অফিসে বক্তব্য রাখার সময় ট্রাম্প বলেন, লেবাননের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের “ভালো সম্পর্ক” রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে তিনি সার্বিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন, কিন্তু হিজবুল্লাহ তাদের জন্য একটি কাঁটা হয়েই আছে।
তিনি বলেন, আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ইসরায়েলের সাথে লেবাননের আসলে এক ধরনের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তাদের একটি অভিন্ন সমস্যা আছে, আর তা হলো হিজবুল্লাহ।”
উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স তিন সপ্তাহের এই বর্ধিত সময়কে একটি “গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত” বলে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলি প্রতিনিধি ইয়েহিয়েল লাইটারআমরা আশা করি, আপনার নেতৃত্বে আমরা অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শান্তিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে পারব।
লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহও তার সমর্থনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার ইরান-সমর্থিত জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করার জন্য লেবাননের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে সার বলেন, লেবাননের সাথে আমাদের কোনো গুরুতর মতবিরোধ নেই। কয়েকটি ছোটখাটো সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, যেগুলোর সমাধান করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “দুই দেশের মধ্যে শান্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে বাধা একটাই: হিজবুল্লাহ।” তিনি আরও বলেন যে, লেবাননের “সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং ইরানি দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির এক ভবিষ্যৎ” থাকতে পারে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর দুই দিন পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে সর্বশেষ যুদ্ধটি শুরু হয়।
এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে এবং স্থলপথে আক্রমণ চালিয়ে সীমান্ত বরাবর কয়েক ডজন শহর ও গ্রাম দখল করে নেয়।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের অভ্যন্তরে প্রায় ছয় মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বাফার জোন দখল করে রেখেছে। ইসরায়েল বলেছে, এর লক্ষ্য হলো উত্তর ইসরায়েলের দিকে ছোড়া স্বল্প-পাল্লার রকেট ও ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা।
হিজবুল্লাহ আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। জঙ্গি গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক পরিষদের একজন উচ্চপদস্থ সদস্য ওয়াফিক সাফা বলেছেন, সরাসরি আলোচনার সময় হওয়া কোনো চুক্তিই তারা মানবে না।
তা সত্ত্বেও, এই আলোচনা এমন দুটি দেশের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ, যাদের মধ্যে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং যারা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধরত।
লেবানন সরকার আশা করছে, এই আলোচনা যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের পথ প্রশস্ত করবে। যদিও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার শর্ত হিসেবে লেবানন ও এই অঞ্চলের যুদ্ধের অবসানকে রেখেছে, লেবানন নিজের প্রতিনিধিত্ব করার ওপর জোর দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে উভয় পক্ষই একাধিকবার তা লঙ্ঘন করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছানো একটি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি চালালে উদ্ধারকারীরা তার কাছে পৌঁছাতে পারেননি। কয়েক ঘণ্টা পর একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা বা উদ্ধারকারীদের ওপর গুলি চালানোর কথা অস্বীকার করলেও, ওয়াশিংটন আলোচনার আগে এই ঘটনাটি লেবাননে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর লেবাননের উপ-প্রধানমন্ত্রী তারেক মিত্রি বলেছেন, সরকার ইসরায়েলের কথিত যুদ্ধাপরাধের বিবরণ দিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে এবং মন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক যুদ্ধে লেবাননে শত শত নারী ও শিশুসহ প্রায় ২,৩০০ জন নিহত এবং দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
গত সপ্তাহের আলোচনাটি ছিল ১৯৯৩ সালের পর ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রথম।




Comments