একসময় তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট নায়ক। বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি! এরপর হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। আর এখন তার পরিচয়-‘কয়েদি নম্বর ৮০৪’। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের একটি নির্জন কক্ষে কাটছে ইমরান খানের দিন। চলতি সপ্তাহেই পূর্ণ হতে যাচ্ছে তার একাকী কারাজীবনের তিন বছর। তবে ঠিক এই সময়েই পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভেসে উঠেছে নতুন প্রশ্ন-আদিয়ালার দরজা কি অবশেষে খুলতে যাচ্ছে?
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য অবজারভার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ইমরান খানের পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের মাধ্যমে তার সম্ভাব্য মুক্তি নিয়ে নীরবে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি এতটাই সংবেদনশীল যে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, বরং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সীমিত যোগাযোগেই এগোচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া।
একটি সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা পাকিস্তানের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে এই অচলাবস্থার অবসান প্রয়োজন। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন ইমরান খান।
২০২৩ সালে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতির পর দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তারপর থেকে কার্যত জনসম্মুখ থেকে হারিয়ে গেছেন তিনি। ২৬ কোটির দেশের সবচেয়ে পরিচিত মুখটিকে এই দীর্ঘ সময়ে দেখা গেছে মাত্র একবার। সেটিও আদালতের একটি অনলাইন শুনানির সময় ফাঁস হওয়া কয়েকটি ছবিতে।
এই দীর্ঘ নীরবতার মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি বড় উদ্বেগ-ইমরানের স্বাস্থ্য!
৭৩ বছর বয়সী এই নেতার চলতি বছরের শুরুতে চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে তার সঙ্গে কোনো স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগ নেই। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গেও দেখা করার সুযোগ সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ এতটাই বেড়েছে যে একপর্যায়ে মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে পড়ে।
দ্য অবজারভারকে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে ইমরানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খান বলেছেন, তাদের বাবা সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ একাকী কারাবাস স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে তার। নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় উদ্বেগ বেড়েছে আরও।
একই সুর শোনা গেছে ইমরানের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ জুলফি বুখারির কণ্ঠেও। তার দাবি, ইমরানের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। সরকার যদি ন্যূনতম দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে স্বাস্থ্যগত কারণেই ইমরান খানকে মুক্তি দেওয়া উচিত!
পাকিস্তানের রাজনীতিতে অবশ্য এমন ঘটনা একেবারে নতুন নয়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাই অনেকের ধারণা, ইমরানের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যগত বিষয়টিকে সামনে এনে একই ধরনের একটি পথ খোলা হতে পারে।
তবে পার্থক্যও আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইমরানের মুক্তির সঙ্গে কঠিন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হতে পারে। দেশ ছাড়তে হবে, সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে এবং প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যাবে না-এমন সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইমরান খান কি সেই শর্ত মানবেন?
১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলকে কোণঠাসা বাঘের মতো লড়াই করার যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকে কাছ থেকে চেনেন এমন অনেকে মনে করেন, আপস তার স্বভাব নয়। মানবাধিকার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথও সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। তার মতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের গতিময় পেস আক্রমণের সামনেও যিনি হেলমেট পরতে অনীহা দেখিয়েছিলেন, তিনি রাজনৈতিক লড়াইয়েও সহজে নীরব থাকার মানুষ নন!
অন্যদিকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার ইমরানের সম্ভাব্য মুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর বক্তব্য, ইমরান সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসাজনিত কারণে জামিন পাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর সিদ্ধান্ত আদালতই নেবে।
ক্রিকেট মাঠ থেকে রাজনীতি-ইমরান খানের পুরো জীবনই নাটকীয় মোড়ে ভরা। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থেকে বন্দি-প্রতিটি অধ্যায়ই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এবার সেই গল্পে কি যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন অধ্যায়? আদিয়ালার নির্জন কক্ষ থেকে কি আবারও জনসম্মুখে ফিরবেন পাকিস্তানের সবচেয়ে আলোচিত রাজনীতিক?
উত্তর এখনও অজানা। তবে এটুকু নিশ্চিত, ‘কয়েদি নম্বর ৮০৪’-কে ঘিরে পাকিস্তানের রাজনীতি আবারও নতুন করে ছড়াতে শুরু করেছে উত্তাপ!
মানবকণ্ঠ/এমআর




Comments