Image description

বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা। হত্যা, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট অপরাধে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বেড়েই চলছে। সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দেশটিতে আরও পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

ওইদিন দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এর আগে দুই বাংলাদেশি নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সরকারি বিবৃতির ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচজনই সৌদি নাগরিক। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি একটি সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেওয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা’ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শিয়া অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির সংখ্যালঘু শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস এই অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরবে বৈষম্য ও প্রান্তিকতার শিকার হওয়ার অভিযোগ জানিয়ে আসছে শিয়া সম্প্রদায়।

তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য এবং তাদের অপরাধের সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস। সংগঠনটির দাবি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচজনের একজনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকা অবস্থায় করা কাজের অভিযোগে দণ্ডিত করা হয়েছিল।

সংগঠনটি বলেছে, ওই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আইন ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। তাদের মতে, সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে।

মানবাধিকার সংগঠনটির এই অভিযোগের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনও প্রতিক্রিয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সন্ত্রাসবাদের মামলায় এ বছর ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে সৌদি আরবে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে দেশটির পূর্বাঞ্চলে।

গত বছর একই ধরনের অভিযোগে ৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

এর আগে ২০২৫ সালে সৌদি আরবে রেকর্ডসংখ্যক ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে এএফপি। মৃত্যুদণ্ডের এই উচ্চ হার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

হুতিদের হামলার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
সৌদি আরবে একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে রয়েছে দেশটি।

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সামরিক সমর্থন দিয়ে আসছে রিয়াদ। অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত হুতিরা ওই সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার বিষয়টিও দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আলোচনায় রেখেছে।

তবে এসব হামলার সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাগুলোর সরাসরি কোনও সম্পর্ক রয়েছে- এমন তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বিশ্বে তৃতীয় সৌদি আরব
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যায় বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে ছিল সৌদি আরব। এ তালিকায় দেশটির আগে ছিল চীন ও ইরান।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োজনীয়। দেশটির সরকার আরও বলে, সব ধরনের আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পরই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক ব্যবহার, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সংঘটিত কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।

সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে নতুন করে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের নীতি নিয়ে সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।
সূত্র: ফিলিপাইন ডেইলি ইনকোয়ারার
এমআর