Image description

দুপুরের রোদ যেন শহরের উত্তাপকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সকাল থেকেই উত্তেজনা। বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, স্লোগান, যানবাহন চলাচল ব্যাহত। দোকানপাটও অনেকেই আগেভাগে বন্ধ করে দিয়েছে।
শহরের ব্যস্ততম সড়কের মোড়ে "রঙতুলি ফ্যাশন" নামের একটি পোশাকের শো-রুম। মালিক সাইফুল ইসলাম কাচের দরজার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। কর্মচারীরা বারবার বলছিল,
— স্যার, আজ দোকান বন্ধ করে দিই?
সাইফুল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
— আর একটু দেখি। মানুষজন যদি বিপদে পড়ে, অন্তত পানি খাওয়ার জায়গাটা খোলা থাকুক।
কথা শেষ হতেই বাইরে হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। আতঙ্কিত মানুষ যে যেদিকে পারছে ছুটছে। কেউ চিৎকার করছে, কেউ স্বজনকে খুঁজছে, কেউ আবার আহত একজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
এক তরুণী কাচের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল,
— ভাই, একটু ভেতরে ঢুকতে দেবেন? বাইরে খুব ভয় লাগছে।
সাইফুল আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।
— সবাই ভেতরে আসুন। দরজা খুলে দিন।
মুহূর্তের মধ্যে শো-রুমটি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী, এক রিকশাচালক, দুই নারী, এক বৃদ্ধ, কয়েকজন পথচারী—যে যেভাবে পেরেছে ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বিক্রয়কর্মী নীলা পানির বোতল এনে সবাইকে দিল। ক্যাশিয়ার রাহাত গুদামঘর থেকে একটি ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এল।
এক তরুণের হাত কেটে রক্ত পড়ছিল।
রাহাত বলল,
— ভাই, হাতটা একটু ধরুন।
ব্যান্ডেজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে নতুন একটি সাদা টি-শার্টের কাপড় ছিঁড়ে ক্ষতস্থানে বেঁধে দিল।
তরুণটি বিস্মিত হয়ে বলল,
— ভাইয়া, দোকানের কাপড় নষ্ট হলো।
রাসেল মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— কাপড় আবার কেনা যাবে। রক্তটা আগে বন্ধ হোক।
এক কোণে বসে থাকা দুই শিশু ভয়ে কাঁদছিল। তাদের মা বারবার বলছিলেন,
— কিছু হবে না বাবা, একটু অপেক্ষা করো।
রাহাত খেলনার তাক থেকে একটি ছোট্ট টেডি বিয়ার এনে শিশুদের হাতে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কান্না থেমে গেল।
শো-রুমের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত পরিবেশ। দামি শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস আর স্যুটের সারির মাঝখানে মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে। কেউ কারও পরিচয় জানতে চাইছে না। শুধু একটাই প্রশ্ন—
— আপনি ঠিক আছেন তো?
এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
— আমি জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু বিপদের সময় মানুষ যে এত বড় হয়ে উঠতে পারে, তা আজ আবার দেখলাম।
সাইফুল কর্মচারীদের বললেন,
— যত বিস্কুট আছে বের করো। সবাই ভাগাভাগি করে খাবে।
একজন কর্মচারী ফিসফিস করে বলল,
— স্যার, এতে তো অনেক ক্ষতি হবে।
সাইফুল শান্ত গলায় বললেন,
— আজ হিসাবের খাতা বন্ধ থাক। আজ শুধু মানুষের হিসাব।
বাইরের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল। সন্ধ্যার আলো নেমে এলে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল।
যাওয়ার আগে আহত তরুণটি সাইফুলের হাত ধরে বলল,
— আপনার নাম জানি না। কিন্তু জীবনে কোনো দিন ভুলব না।
একজন বৃদ্ধা চোখের পানি মুছে বললেন,
— আজ এই দোকানটা না থাকলে কোথায় যেতাম, জানি না।
সাইফুল শুধু বললেন,
— ভালো থাকবেন। মানুষকে সুযোগ পেলে সাহায্য করবেন। এটাই যথেষ্ট।
কয়েক মাস পরে শহর আবার স্বাভাবিক হলো। শো-রুমে আগের মতো ক্রেতাদের ভিড় ফিরল। কিন্তু দোকানের এক কোণে নতুন একটি ফ্রেম ঝুলতে দেখা গেল।
তাতে লেখা ছিল—
"বিপদের দিনে এই দরজা ক্রেতাদের জন্য নয়, মানুষের জন্য খোলা ছিল। পোশাকের চেয়ে মূল্যবান ছিল মানুষের জীবন।"
অনেক ক্রেতাই কেনাকাটা শেষ করে সেই লেখাটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন। কেউ কিছু বলতেন না। শুধু নীরবে পড়তেন, তারপর দোকান থেকে বেরিয়ে যেতেন।
কারণ সেই শো-রুম একদিন শুধু কাপড় বিক্রি করেনি—অস্থিরতার এক বিকেলে অসহায় মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের দরজা খুলে দিয়েছিল। সেই স্মৃতি থেকে গিয়েছিল শহরের মানুষের হৃদয়ে, মানবিকতার এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর