২০২৪ সালের জুলাই, ঢাকা শহর যেন এক অদৃশ্য দাবার বোর্ড। প্রতিটি মোড়ে পুলিশ, প্রতিটি গলিতে গোয়েন্দাদের চোখ। খিলগাঁও, মালিবাগ, মতিঝিল, পুরানা পল্টন, নয়াপল্টন, কাকরাইল, শাহবাগ, শহীদ মিনার—সবখানেই একই নাম ঘুরে বেড়ায় ফিসফিসিয়ে।
শাহীন খান।
কেউ বলে তিনি লম্বা। কেউ বলে মাঝারি গড়নের। কেউ বলে দাড়িওয়ালা, কেউ বলে একেবারে পরিষ্কার মুখ। একজন বলে তিনি মোটরসাইকেলে চলেন, আরেকজন শপথ করে বলে তিনি সারাদিন হেঁটেই ঘোরেন।
আসলে কেউই নিশ্চিত নয়।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিদিনের ব্রিফিংয়ে একটাই প্রশ্ন উঠত, "শাহীন খান আজ কোথায়?"
কিন্তু উত্তর আসত না।
সকালে খিলগাঁওয়ের মিছিলে হঠাৎ করে শত শত পানির বোতল এসে পৌঁছায়। কেউ জানে না কে এনে রাখল।
দুপুরে কাকরাইলে ব্যানার আর ফেস্টুন পৌঁছে যায় ঠিক সময়ে।
বিকেলে মতিঝিলে মাইক নষ্ট হয়ে গেলে মিনিট দশেকের মধ্যে আরেকটি মাইক চলে আসে।
রাতে পুরানা পল্টনে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের জন্য থানায় খাবার পৌঁছে যায়। সঙ্গে আইনজীবীও।
কেউ একজন সবকিছু সমন্বয় করছে।
কিন্তু তিনি কোথায়?
একদিন পুলিশের একটি দল খবর পেল—শাহীন খান নাকি ফকিরাপুলের একটি মেসে রাত কাটাবেন।
রাতভর অভিযান হলো।
প্রতিটি রুম তল্লাশি করা হলো।
মিলল শুধু কয়েকটি খালি পানির কার্টন, কিছু ব্যান্ডেজ, আর হাতে লেখা একটি তালিকা—
"আগামীকাল— খিলগাঁও—পানি। মালিবাগ—মাইক। শাহবাগ—প্রাথমিক চিকিৎসা। মতিঝিল—আইনজীবী প্রস্তুত।"
মানুষটি নেই।
আরেকদিন খবর এল, তিনি নাকি পল্টনের একটি অফিসে।
সেখানে পৌঁছে পুলিশ পেল কয়েকটি চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, কিছু শুকনো খাবার আর স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন নম্বর।
লোকটি আবারও উধাও।
এদিকে শহরের নানা জায়গায় কাজ চলছেই।
আহত কেউ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্তদাতার ব্যবস্থা হয়ে যায়।
গ্রেপ্তার হওয়া পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে যায়।
কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে স্বজনদের খুঁজে বের করা হয়। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে মরদেহ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়।
সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে চলছিল যে অনেকেই ভাবত—শাহীন খান বুঝি একজন নন।
হয়তো অনেক মানুষ মিলে একটি নাম হয়ে গেছে।
একজন প্রবীণ পুলিশ কর্মকর্তা একদিন ক্লান্ত গলায় বললেন,
"আমরা একজন মানুষকে খুঁজছি। কিন্তু কাজগুলো দেখে মনে হচ্ছে পুরো একটা নেটওয়ার্ককে খুঁজছি।"
কয়েক দিন পরে শাহবাগে সাধারণ পোশাকে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। প্রচণ্ড রোদ।
একজন তরুণ এসে তাঁর হাতে এক বোতল পানি দিয়ে শুধু বলল,
"ভাই, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন। পানি খান।"
লোকটি ধন্যবাদ জানিয়ে পানি নিলেন।
ছেলেটি ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
সন্ধ্যায় একটি সূত্র জানাল—
"আজ বিকেলে শাহীন খান ওই এলাকায় ছিলেন।"
গোয়েন্দা কর্মকর্তার হঠাৎ হাতের পানির বোতলের দিকে চোখ গেল।
তিনি দীর্ঘক্ষণ বোতলটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে হেসে ফেললেন।
"হয়তো... আজও আমি তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।"
এরপরও অনেক অভিযান হয়েছে।
অনেক তালিকা তৈরি হয়েছে।
অনেক নাম জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে।
কিন্তু শাহীন খানকে নিয়ে নিশ্চিত কোনো ছবি, কোনো ঠিকানা, কোনো রুটিন কখনো কারও হাতে আসেনি।
শহরের অলিগলিতে শুধু একটি কথাই ছড়িয়ে পড়েছিল—
"যে ছেলেটা তোমার হাতে পানি তুলে দিল, যে আহতকে হাসপাতালে নিয়ে গেল, যে গ্রেপ্তার হওয়া পরিবারের পাশে দাঁড়াল—হয়তো সে-ই শাহীন খান। আর যদি সে না-ও হয়, তবে সে এমন একজন, যে নিজের পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনকে বড় করে দেখেছিল।"
কিছু মানুষ ইতিহাসে ছবি হয়ে থাকে।
কিছু মানুষ থেকে যায় কেবল গল্পে।
আর কিছু মানুষ—
ছায়ার মতো কাজ করে, ছায়ার মতোই অদৃশ্য হয়ে যায়।
মানবকন্ঠ/এমআর




Comments