Image description

ইটের শহরের চার দেয়াল আর মোবাইল-ট্যাবের নীল আলোয় বন্দি শৈশবকে একটু স্বস্তি দিতে রাজধানীর মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে বসেছিল শিশুদের এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা। ইট-পাথরের ক্লান্তি ভুলে সবুজ পাতার ফাঁকে পাখির ডাক শুনে আর ঘাসের গন্ধে মেতে ওঠার এই প্রয়াস চালিয়েছে ‘প্রকৃতিপাঠ পাঠশালা’। তাদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘বন্যপ্রাণের গল্পকথা’ শীর্ষক এক অনন্য ন্যাচার ক্যাম্প।

সকাল সাড়ে সাতটায় রোদ ওঠার মুখেই ৫ থেকে ১৫ বছরের একঝাঁক প্রাণবন্ত শিশু জমে ওঠে বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রাঙ্গণে। সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকেরাও। শুরুতে পরিচয় পর্ব ও কুশল বিনিময়ের পর শুরু হয় মূল অভিযান—সবুজ প্রকৃতির বুকে ঘুরে ঘুরে বন্যপ্রাণী ও পাখিদের চেনা।

নোটপ্যাড হাতে নিয়ে উদ্যানের এপাশ-ওপাশ ঘুরে গাছে গাছে পাখির আনাগোনা পর্যবেক্ষণ করা এবং সঙ্গে সঙ্গে ছবি এঁকে পাখির বৈশিষ্ট্য লিখে রাখার মতো সৃজনশীল আনন্দে মেতে ওঠে খুদে শিক্ষার্থীরা।

বর্তমানে শিশুদের সিংহভাগ সময় কাটছে ডিজিটাল স্ক্রিনে। এই স্ক্রিননির্ভরতা থেকে বের করে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখানোই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

আয়োজন নিয়ে প্রকৃতিপাঠ পাঠশালার উদ্যোক্তা ও এভারেস্টজয়ী ইকরামুল হাসান শাকিল বলেন, "আমাদের সন্তানরা প্রকৃতির প্রতি সহমর্মিতা ও ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে উঠুক। প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যই হোক তাদের মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ। বইয়ের শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হোক তাদের মেধা ও মনন—সেটাই আমাদের চাওয়া।"

ক্যাম্পে শিশুদের শিক্ষক ও মেন্টর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বিইআরসির চেয়ারম্যান, পাখিবিদ জালাল আহমেদ শিশুদের শেখান পাখির গল্প। তিন ঘণ্টার ক্যাম্প শেষে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, "এখানে এসে শিশুদের সঙ্গে দারুণ সময় কেটেছে। খেলার ছলে তারা প্রকৃতিকে চিনতে পারছে—এই উদ্যোগ চমৎকার।"

পাখির পাশাপাশি গাছপালা, ফুল ও পাতার বিচিত্র রূপ নিয়ে গল্প শোনান বোটানিক্যাল গার্ডেনের সাবেক প্রধান বোটানিস্ট শামসুল হক, উদ্ভিদবিদ ও স্থপতি তুঘলক আজাদ মিঠু এবং শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ খাদিজা বাপ্পী। গল্প, পর্যবেক্ষণ আর সরাসরি হাতে-কলমে শেখার সুযোগে চার দেয়ালের বাইরের এই পাঠশালা শিশুদের জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দের ঠিকানা।

সন্তানদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে মুগ্ধ অভিভাবকেরাও জানান, শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ও পরিবেশ সচেতনতার জন্য এ ধরনের ক্যাম্প নিয়মিত হওয়া উচিত।

ক্যাম্পে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সহ-উদ্যোক্তা ও পর্বতারোহী সাদিয়া সুলতানা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহফুজুল আলম মাসুম, আনন্দ বিনোদনের সম্পাদক এসএএম সুমন এবং নগর-পরিকল্পনাবিদ বিবি খাদিজাসহ অনেকে।

উল্লেখ্য, ‘প্রকৃতিপাঠ পাঠশালা’ মূলত ‘ব্রেথ অব ন্যাচার (বন) ফাউন্ডেশন’-এর একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষামূলক আয়োজন। দিনব্যাপী এই আনন্দময় অভিজ্ঞতার সমাপনী ঘটে প্রতিটি খুদে শিক্ষার্থীর হাতে সনদপত্র তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। শিশুরা ঘরে ফেরে একঝাঁক সতেজ অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির প্রতি নতুন ভালোবাসা নিয়ে।