Image description

২০২৬ সালের জানুয়ারির এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল মৃদুল। রাজনীতি, খেলা, অর্থনীতি—সবকিছুই দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি ছবিতে তার দৃষ্টি থেমে গেল।
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি বিভাগের সর্বোচ্চ নম্বরধারী রিফাত।"
ছবির ছেলেটির মুখে এক ধরনের শান্ত হাসি। কিন্তু তার একটি চোখ নেই।
মৃদুল ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
— "এই মুখটা... কোথায় দেখেছি?"
সে ছবিটা আরও কাছে টেনে নিল।
হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— "অসম্ভব... এ তো সেই ছেলে!"
২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের ভয়াল বিকেলটা যেন আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
চারদিকে গুলির শব্দ।
টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে আছে।
মৃদুল, সজীব, রাফি আর নিলয় একটি গলির ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ একজন তরুণ দৌড়ে এসে পড়ে গেল তাদের সামনে।
— "ভাই... বাঁচান..."
তার মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
বাম চোখের পাশ থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে।
সজীব ভয় পেয়ে বলল,
— "ওকে বাসায় নিলে যদি পুলিশ আসে?"
রাফি বলল,
— "এভাবে ফেলে রাখব?"
মৃদুল দৃঢ় গলায় বলল,
— "আগে মানুষটাকে বাঁচাই। পরে যা হওয়ার হবে।"
তারা চারজন মিলে ছেলেটিকে কাঁধে তুলে পাশের বাসায় নিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ করে দিল।
মৃদুল ভেজা তোয়ালে এনে রক্ত মুছতে লাগল।
— "ভাই, আপনার নাম?"
কষ্টে চোখ খুলে ছেলেটি বলল,
— "মুন্না..."
— "কোথায় থাকেন?"
— "পরে বলব... আগে একটু পানি..."
নিলয় দ্রুত এক গ্লাস পানি এনে দিল।
পানি খেয়ে ছেলেটি ফিসফিস করে বলল,
— "আমাকে বাইরে দেবেন না... ওরা দেখলে শেষ করে দেবে।"
মৃদুল তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
— "ভয় পাবেন না। আপনি এখন নিরাপদ।"
রাফি স্থানীয় এক ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে কথা বলল।
ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে তারা ক্ষত পরিষ্কার করল।
ছেলেটি বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
— "আমার যদি কিছু হয়ে যায়..."
মৃদুল থামিয়ে দিল।
— "না। এসব কথা বলবেন না। আপনি ঠিক হয়ে যাবেন।"
ছেলেটি দুর্বল হাসল।
— "যদি বেঁচে থাকি... আবার দেখা হবে।"
রাত গভীর হলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
বিদায় নেওয়ার আগে সে শুধু বলেছিল,
— "আপনাদের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
তারপর সে চলে গেল।
আর কখনো দেখা হয়নি।
বর্তমানে ফিরে এল মৃদুল।
খবরে লেখা—
"জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে একটি চোখ হারিয়েও অসাধারণ ফল করেছে শিক্ষার্থী জুবায়ের রিফাত।"
মৃদুল আস্তে করে বলল,
— "তাহলে... মুন্না নয়, তোমার নাম জুবায়ের।"
পরদিনই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল।
অনেককে জিজ্ঞেস করার পর একজন বলল,
— "ওই যে, বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।"
মৃদুল ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
জুবায়ের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল।
— "মাফ করবেন..."
জুবায়ের ফিরে তাকাল।
— "জি?"
মৃদুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "মুন্না..."
শব্দটা শুনেই জুবায়ের স্থির হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "আপনি... মৃদুল ভাই?"
মৃদুল হেসে মাথা নাড়ল।
পরমুহূর্তেই জুবায়ের তাকে জড়িয়ে ধরল।
তার গলা কাঁপছিল।
— "আমি ভেবেছিলাম আর কোনোদিন দেখা হবে না।"
মৃদুলেরও চোখ ভিজে উঠল।
— "আমরাও তো তাই ভেবেছিলাম।"
দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাঁটতে লাগল।
মৃদুল জিজ্ঞেস করল,
— "একটা চোখ হারিয়ে এত বড় লড়াই করলে কীভাবে?"
জুবায়ের মৃদু হেসে বলল,
— "প্রথম কয়েক মাস খুব কষ্ট হয়েছিল। বই খুললেই মাথা ঘুরত। সবাই বলত, এবার আর হবে না। কিন্তু আমি ভাবলাম, যদি হেরে যাই, তাহলে যারা আমাদের থামাতে চেয়েছিল, তারাই জিতে যাবে।"
— "তোমার পরিবার?"
— "মা অনেক কেঁদেছেন। কিন্তু তিনিই আবার বলেছিলেন— 'চোখ একটা গেছে, স্বপ্নটা যেন না যায়।'"
মৃদুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "তোমার সাহস সত্যিই অসাধারণ।"
জুবায়ের হেসে বলল,
— "সাহস আমি একা পাইনি। সেদিন যদি আপনারা দরজা না খুলতেন, হয়তো আজ আমি বেঁচেই থাকতাম না।"
কথাগুলো শুনে মৃদুল চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর জুবায়ের বলল,
— "চলুন, একটা জায়গায় যাই।"
— "কোথায়?"
— "হাদী ভাইয়ের কাছে।"
বিকেলে আসরের নামাজের পরে তারা শহীদ হাদীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চশব্দে বলল
"আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।" তারপর সুরা ফাতেহা আর সুরা এখলাস পাঠ করলো কয়েকবার এরপরে দোয়া করলো। 
জুবায়ের আকাশের দিকে তাকাল।
— "একটা চোখ নেই। কিন্তু আজও আমি বাংলাদেশকে আগের মতোই দেখি।"
মৃদুল মৃদু হেসে বলল,
— "দেখার জন্য শুধু চোখ লাগে না। লাগে বিবেক।"
সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে।
দুজন ধীরে ধীরে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে এল।
কেউ আর কোনো কথা বলল না।
কারণ কিছু অনুভূতির ভাষা হয় না—শুধু ইতিহাস হয়ে মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়।

মানবকণ্ঠ/এমআর