Image description

নরসিংদীর মনোহরদী পৌর এলাকার লাইফ কেয়ার হাসপাতাল ও রাজিব প্রাইভেট হাসপাতালে সম্প্রতি অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেবার মান এবং ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা তদারকি করতে গিয়ে মনোহরদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সজিব মিয়ার নেতৃত্বাধীন আদালত হাসপাতাল দুটির ফার্মেসি, অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি বিভাগের যন্ত্রপাতি, রিএজেন্ট এবং সার্বিক পরিবেশ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা দুটিতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ সংরক্ষণ করতে দেখেন। এ অপরাধে লাইফ কেয়ারকে ৫০ হাজার টাকা এবং রাজিব প্রাইভেট হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওষুধ জব্দ করা হয়েছে।

এতো গেলো বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র। একই অবস্থা চলছে সরকারি হাসপাতালেও। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিতরণের ঘটণায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যায়। প্রায় দুই মাস আগে মেয়াদ শেষ হওয়া ওষুধ দেয়া হয় রোগীদের হাতে। গত ৩ জুন বিতরণ করা ওষুধের গায়ে মেয়াদ লেখা ছিল ৪ এপ্রিল ২০২৬। অর্থাৎ প্রায় দুই মাস আগেই শেষ হয়েছে মেয়াদ। তারপরও সরবরাহ করা হচ্ছে এই ওষুধ। 

রোগী হামিদুর রহমান জানান, ‘ওষুধের মেয়াদ নেই দেখে ফার্মেসিতে গিয়ে জানালে ওনারা বলেন, ভুল হয়েছে। পরে নতুন করে ওষুধ দেন। যা এক পাতার দুই পাশ থেকে কাটা চারটি ওষুধ। ওখানে কোনো তারিখ দেখা যাচ্ছে না। এখন চিন্তায় আছি এই ওষুধেরও মেয়াদ আছে কি-না।’ অভিযোগের বিষয়ে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ হান্নান সাংবাদিকেদের বলেন, ‘হাসপাতালে নিয়মিত মনিটরিং করা হয় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনিয়ম হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মেসি থেকেও রোগীদের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৪ মে অন্তত অর্ধশতাধিক রোগীকে কয়েক মাস আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ওষুধ সরবরাহ করা হয় বলে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন। সরকারি হাসপাতালের এমন চরম গাফিলতিতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যার কারণে দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে চিকিত্সা নিতে যান শফিকুল ইসলাম নামের এক রোগী। দায়িত্বরত চিকিত্সক তাকে ‘এ্যামডোক্যাল’ ট্যাবলেট প্রেসক্রিপশন লিখে দিলে তিনি হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ওষুধটি সংগ্রহ করেন। ওষুধ খাওয়ার চারদিন পর তিনি লক্ষ্য করেন যে, ট্যাবলেটটির মেয়াদ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই শেষ হয়ে গেছে। শফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি সরকারি হাসপাতালে এভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়া খুবই উদ্বেগজনক। ওইদিন আমার মতো আরও অন্তত অর্ধশতাধিক রোগীকে এই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়া হয়েছিল।’

একই ঘটনার শিকার হয়েছেন দেবিদ্বার পৌর এলাকার মাছুয়াবাদ ডোন এলাকার ট্রাক্টর চালক বিল্লাল হোসেন। তিনি জানান, উচ্চ রক্তচাপের নিয়মিত রোগী হওয়ায় তিনি হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে সেবন করেন। কিন্তু ওষুধ খাওয়ার পর শরীর আরও খারাপ হয়ে পড়লে তিনি ওষুধের পাতার দিকে নজর দেন। তারপর ওষুধগুলো নিয়ে হাসপাতালে আসার পর জানতে পারেন, ওষুধটির মেয়াদ তিন মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। 

দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. কবির হোসেন এ বিষয়ে বলেন, কমপ্লেক্সের স্টোর থেকে ওষুধ নামানোর আগে চেক দেয়া হয়, তারপরও ভুল হয়ে যেতে পারে। কেনো এমন হয়েছে, স্টোরকিপার ও ফার্মেসির সঙ্গে আলোচনা করে জানতে হবে। 

এভাবেই হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে রোগীর হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, তদারকির অভাব, ওষুধ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। কোথাও আবার অপারেশন থিয়েটার, ফার্মেসি ও ওষুধের গুদামে মিলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধের মজুত। শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানে নয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পরিচালিত অভিযান এবং রোগীদের অভিযোগে উঠে এসেছে একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র। চিকিত্সা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; রোগীর নিরাপদ চিকিত্সা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।

রোগীর জীবনে কী ঝুঁকি?: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে রোগীর জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশন, ইনসুলিন, হূদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, শিশুদের ওষুধ এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে মেয়াদ কঠোরভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য। তাদের মতে, সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই ওষুধ ব্যবস্থাপনায় ‘ফার্স্ট এক্সপায়ার, ফার্স্ট আউট’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত স্টক অডিট, ডিজিটাল ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা এবং স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষকরা জানান, ‘মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার দুসপ্তাহ পরেও ওই ওষুধ হয়তো ব্যবহার করা চলে। তবে দুই বছর পরে অবশ্যই নয়।’ তরল জাতীয় ওষুধ, যেমন-চোখের ড্রপ, মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে ওতে ব্যাকটেরিয়া জমতে পারে। ফয়েলে মোড়ানো ট্যাবলেট নতুন করে সিল করা সম্ভব নয়, তাতে ট্যাবলেট স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে উঠতে পারে। তাদেও মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে-এর কার্যকরী উপাদানের ৯৫ ভাগই থাকেনা। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানেই বিষ। ওষুধের গুণগত মান তখনও যতই ভালো থাকুক। যেহেতু যাচাই করার মতো পরিকাঠামো সাধারণ মানুষের কাছে নেই। তাই মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ না খাওয়াই ভালো।

এদিকে শরীর বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে এমন কোনো ওষুধ নেই, যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। প্রত্যেক ওষুধেরই ভালো গুণ, খারাপ গুণ রয়েছে। দেখতে হবে ওষুধের ভালো গুণটা কার্যকর থাকছে কী না। তারা বলছেন, একবার ওষুধের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে আর তা কোনোভাবেই ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে ইন্টারনাল মেডিসিন বা রক্তের সঙ্গে সরাসরি যে ওষুধগুলো মিশে; সেগুলোর মেয়াদ ফুরানোর পর ব্যবহার করলে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। এক্সটারনাল মেডিসিন বা ট্যাবলেট, মলমের ক্ষেত্রেও মেয়াদ ফুরোলে ব্যবহার করা উচিত নয়।

উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন: স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একাধিক হাসপাতালে একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ার পরও কেন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি? কেন নিয়মিত স্টক যাচাইয়ের পরও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীর হাতে যাচ্ছে? তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান কিংবা রোগীদের অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেয়া যথেষ্ট নয়। রোগীর হাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পৌঁছানোর আগেই যেন তা শনাক্ত ও অপসারণ করা যায়, সে জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অডিট এবং দায়িত্বে অবহেলার ক্ষেত্রে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। 

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন মিলিয়ে আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন (প্রায় ২৪ কোটি টাকার মজুত), কৃমিনাশক ওষুধ, র্যাপিড ডায়াগনস্টিক কিট, স্যালাইন ও ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ। এরই মধ্যে গত ৩১ মার্চ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ১০০০ মিলির নরমাল স্যালাইনের একটি বড় অংশ। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এসব জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং সরঞ্জাম গ্রহণ ও বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) কর্তৃপক্ষ। 

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের সহকারী পরিচালক ডা. মো. নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতি মাসেই আমরা মজুতের বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ডিস্ট্রিবিউটের জন্য চিঠি দিয়ে থাকি। সম্প্রতি চিঠি দেয়ার পর কিছু ওষুধ বা ভ্যাকসিন ডিস্ট্রিবিউট করা হয়েছে।