পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম সহযোগী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশের তিন আলোচিত জেনারেল এখন ভারতের কলকাতায় নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন। তাঁরা হলেন— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (বরখাস্ত) মো. মুজিবুর রহমান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন এবং মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ। ঢাকা ও কলকাতার একাধিক নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই তিন জেনারেলকে সম্প্রতি কলকাতার সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় সরিয়ে নিয়েছে মোদি সরকার।
সূত্র জানায়, ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর শেখ হাসিনার পতনের পরপরই জেনারেল মুজিব ও জেনারেল আকবর দেশ ছেড়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। অন্যদিকে, গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হলে গত বছরের অক্টোবরে মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদও সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। শুরুতে তাঁরা কলকাতার অভিজাত এলাকা সল্টলেক ও নিউ টাউনের সঞ্জিবা গার্ডেন কমপ্লেক্সে বসবাস করলেও সম্প্রতি তাঁদের অধিকতর নিরাপত্তার জন্য হুগলি ব্রিজের পাশে অবস্থিত সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এই এলাকাটি অত্যন্ত সংরক্ষিত এবং বিশেষ পাস ছাড়া সাধারণের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ।
কলকাতার নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই তিন জেনারেল সেখানে বসেই নিয়মিত শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এছাড়া তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং ভারতীয় ডিপ স্টেটের সহায়তায় বাংলাদেশে আবারও অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা করছেন। সম্প্রতি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গেও তাঁদের দেখা গেছে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (বরখাস্ত) মো. মুজিবুর রহমান: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এবং সামরিক বাহিনীতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নেটওয়ার্ক তৈরির মূল কারিগর হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর ৬ আগস্ট তিনি সেনাবাহিনীতে ক্যু করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন। এছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওপর হামলার পরিকল্পনাকারীও ছিলেন তিনি। বর্তমানে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে এবং তাঁদের বিপুল সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন: সাবেক এই ডিজিএফআই প্রধানকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড বলা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে জোরপূর্বক সিএমএইচে বন্দি রাখা এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে দেশত্যাগে বাধ্য করার নেপথ্যে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। গুম ও আয়নাঘরে নির্যাতনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে।
মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ: শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক সচিব জেনারেল কবীর গত বছরের অক্টোবরে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে ভারতে যান। জুলাই বিপ্লবের সময় বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের জিওসিদের ফোন করে ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গুম ও নির্যাতনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
এই তিন জেনারেলের ভারতে অবস্থানকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, "ভারত এই জেনারেলদের আরাম-আয়েশের জন্য আশ্রয় দেয়নি, বরং নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যবহারের জন্য রেখেছে। এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি।"
আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রফেসর এম শহীদুজ্জামান বলেন, "এই জেনারেলরা বাংলাদেশের অনেক স্পর্শকাতর তথ্য জানেন। ভারত তাঁদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং বাংলাদেশে উসকানি দিচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত তাঁদের বিচার সম্পন্ন করা এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে তুলে ধরা।"
বিশ্লেষকদের মতে, পলাতক এসব অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়তে পারে, যদি বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে সঠিক কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে পারে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments