গাড়িচালকের চাঞ্চল্যকর তথ্য, তরুণীকে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখান এমপি নজরুল
সংসদে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম। বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখার জন্য ওই তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দিয়ে কোটিপতি বানানোর প্রলোভনও দেখিয়েছিলেন তিনি। এমনটিই দাবি করেছেন গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান।
তার ভাষ্য, টাকার লোভে ওই তরুণীর মা-বাবা ওই এমপির সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করেননি। গত শনিবার বিকালে কথা হয় গাড়ি চালক ওবায়দুর রহমানের সাথে। তিনি এরই মধ্যে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছেন।
সম্পর্কে ওই তরুণীর মামা হন ওবায়দুর। গাজী নজরুলের গাড়ি চালানোর পাশাপাশি তার সঙ্গে ওবায়দুরের আত্মীয়তা রয়েছে মেয়েটির বাবার সূত্রে। ওবায়দুর জানান, গাজী নজরুল সম্পর্কে মাসুম বিল্লাহর খালু।
জামায়াতে ইসলামীর এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তে’র একটি ভিডিও সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ভিডিওতে তার সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা যায়। আলোচনায় ওঠার পর গাজী নজরুল জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী।
গাজী নজরুল তখন অভিযোগ করেছিলেন, ১৩ জুলাই ওই তরুণীর বাবার অফিসে তাঁকে জিম্মি করে ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন ওবায়দুর রহমান। ভিডিও ফাঁসও তিনিই করেছেন। অন্যদিকে ২১ জুলাই রাজধানীর পল্লবী থানায় গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ওবায়দুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভাগনির ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করা এবং ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় সন্দেহের জেরে ১৪ জুলাই তার ওপর হামলা চালানো হয়।
‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে, বলেছিলেন মেয়েটির বাবা’: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ওই তরুণীর পল্লবীর ভাড়া বাড়িতে গাজী নজরুলের যাতায়াত ছিল বলে জানান ওবায়দুর। তার ভাষায়, এমপি হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পরও গাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় আসলে ওই তরুণীর বাড়িতেই থাকতেন। ওবায়দুর দাবি করেন, ভাগনির সঙ্গে গাজী নজরুলের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে সেটি পরিবারের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তবে মেয়েটির মা-বাবা তা গোপন রাখতে চাইছিলেন। ওবায়দুরের ভাষায়, তার বোনের স্বামী মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, ‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে। পাঁচ বছরে আমাদের অনেক কিছু করে নিতে হবে।’
এই ‘কিছু করে নেওয়া’র তথ্যও দেন ওবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরেই মাসুম বিল্লাহর নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেন গাজী নজরুল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মাসুম এন্টারপ্রাইজ’। মাসুমের কাজ ছিল শুধু দরপত্র জমা দেওয়া। কাজ পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেন গাজী নজরুল নিজেই। সাথে ব্যাংক লোনের আশ্বাসও দিয়ে ছিলেন তরুণীর বাবাকে।
ওবায়দুর বলেন, ‘মাসুম কন্ট্রাক্টরির কিছুই বুঝত না। দায়িত্ব দেয় আমাকে। আমিও এসবের কিছু বুঝি না। তারপরও খেজুরের ব্যবসা বন্ধ করে টেন্ডারের বিষয়টি দেখাশোনা করছিলাম।’ তার দাবি, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সাতক্ষীরার দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মোট পাঁচটি কাজের দরপ্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এবং বাকিগুলো শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের।
ওবায়দুর দাবি করেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি পদে তাদের অনুকূল একজন প্রকৌশলীকে বদলি করে আনার জন্য এমপি নিজেই তদবির করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ দেওয়ার জন্য ওই প্রকৌশলীকে সেখানে বসানো হয়েছিল।’ ওবায়দুর বলেন, এমপি আমাকে এক মাসের জন্য একটি বাসা ভাড়া করতে বলে তখন আমি সেটা না করে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আমি একদিনের জন্য একটি বাসা ভাড়া করি। সেখানে তারা আসার আগে আমি একটা ডিভাইস সেট করে রাখি। তারা সে রুমে আসার পরে নিচে একজন মুরব্বি মানুষ কাকে যেন ফোনে বলছিলেন তোরা আয় এদিকে ধান্দা আছে। আমি এটা শুনে দৌড়ে চার তলায় যাই। তাদের রুমে গিয়ে বলি মানুষ জড়ো হচ্ছে। যে যার মতো এখান থেকে চলে যাও। এসময় আমার ভাগনী ও এমপি বাথরুমে গেলে আমি ডিভাইসটা পকেটে নিয়ে নিচে চলে আসি।
এর পরে কিছু লোক আসে এবং তাদের সেখানে আটকিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। তাদের টাকা দেয়ার জন্য এমপিসহ ব্যাংকে যায় আর আমার ভাগনিকে এক মহিলার বাসায় নিয়ে রাখে। টাকা নিয়ে ফিরে আসলে তাদের হাতিরঝিলের দিকে নিয়ে গিয়ে সিএনজিতে তুলে দেয়। এরপরে তারা কাওরানবাজার যায়। সেখান থেকে আমার ভাগনি তাদের মিরপুরের বাসায় চলে আসে। এমপি কোথায় গিয়েছে সেটা আমার জানা নাই।
মেয়েটিকে সংসদে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি ওবায়দুরের। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে বলা হতো সংসদে চাকরি দেওয়া হবে। আর বাবাকে বলা হতো, বড় বড় কাজ দেয়া হবে। এই লোভ দেখিয়েই পুরো বিষয়টি চলছিল।’
মুখ বন্ধ রাখতে ‘প্রলোভন’ দেখানো হয়: ওবায়দুর রহমানের দাবি, গত ২০ জুন এমপি হোস্টেলে গিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের কাছে ভাগনির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তখন গাজী নজরুল ‘মুতআ বিয়ে’র (অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ে) ফতোয়া দিয়ে সম্পর্কটি বৈধ বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর মুখ বন্ধ রাখতে গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে একটি গাড়ি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন ওবায়দুর। তার ভাষ্য, তাকে বলা হয়েছিল এমপি ঢাকায় থাকলে তিনি ওই গাড়ি চড়বেন। আর বাকি সময় গাড়িটি নিজের মতো ব্যবহার করে আয় করতে পারবেন ওবায়দুর। পাশাপাশি তাকে এমপির এপিএস-২ (সহকারী একান্ত সচিব) হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।
ওবায়দুরের এসব বক্তব্যের বিষয়ে জানতে গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকভাবে যোগাযোগ করলে তার ব্যক্তিগত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে এরই মধ্যে গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এরপর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটির বাবা মাসুম বিল্লাহর ফোনে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে ভিডিও প্রকাশের পর গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রীর পাশাপাশি ওই তরুণীও একটি ভিডিও বক্তব্য দেন, সেখানে তিনি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগ করেন। ওই তরুণী বলেন, ২০২৬ সালের ১৭ জুন উভয় পরিবারের সম্মতিতে সাতক্ষীরা শ্যামনগর তার বাবার বাড়িতে তার ও গাজী নজরুলের বিয়ে হয়। বিয়েতে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ১৩ জুলাই ঢাকায় মগবাজার তার বাবার অফিসে গেলে পরিকল্পিতভাবে একটি ‘অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি’ তৈরি করা হয় এবং পরে তাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়।




Comments