Image description

রাজধানীর অপরাধের ধরন যেন ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, সশস্ত্র হামলা, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মতো অপরাধের পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠছে সংগঠিত অপরাধচক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর এবং ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতায় এমন চিত্রই সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সক্রিয় গ্যাং এবং তাদের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই বড় পরিসরে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানা গেছে।

যে ঘটনাগুলো বদলে দিয়েছে পরিস্থিতির হিসাব

রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর কেড়েছে। ইসিবি চত্বর-সংলগ্ন এলাকায় নিউগিনি প্রপার্টিজ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিক ভাঙচুর এবং মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় জমি দখলের অভিযোগ—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি বৃহত্তর অপরাধ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।

এর পরই অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এক শহর, একাধিক অপরাধ হটস্পট

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যালোচনায় ঢাকার কয়েকটি অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় চাঁদ উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, বসিলা, শ্যামলী হাউজিং এবং জেনেভা ক্যাম্পকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্যাং ও অপরাধী চক্রের তৎপরতার কথা উঠে এসেছে।

মিরপুর-পল্লবী অঞ্চলে মিরপুর-১, ২, ৬, ১০, ১১, ১৩ ও ১৪ নম্বর এলাকা, কালশী গোরস্থান লেন, বাউনিয়া বাঁধ ও বাইগারটেকও তালিকায় রয়েছে। এখানে একাধিক গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসিবি চত্বর ও ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদী এলাকার কিছু অংশও সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিশেষ নজরে এসেছে।

শুধু কিশোর গ্যাং নয়, নজরে ‘গডফাদার’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—মাঠের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ না করা।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১৫৮টি এবং এসব গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ২১৯ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব চক্রের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে কার বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই করাই হবে মূল বিষয়।

বিদেশে থাকা অপরাধীদের যোগাযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

গোয়েন্দা সংস্থার পর্যালোচনায় দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধীর সঙ্গে দেশীয় অপরাধী চক্রের যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কল ও বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপের মাধ্যমে দেশে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এখন শুধু ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের ওপর নয়; অপরাধের অর্থ, নির্দেশনা ও সাংগঠনিক কাঠামোর দিকেও।

অভিযানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

তাৎক্ষণিক অভিযানের পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে বলে দেওয়া তথ্যগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে হটস্পটে টহল বৃদ্ধি, বডি ক্যামেরা ও সিসিটিভি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, ৯৯৯ সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট ও সাইবার-মাদক প্রতিরোধ সেল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আর দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে অপরাধপ্রবণ এলাকায় এআই-নির্ভর সিসিটিভি নজরদারি এবং থানার অপারেশন ও তদন্ত কার্যক্রম আলাদা করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

‘ক্লিন হার্ট’ কি ফিরছে?

২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। তবে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একই নামে বা একই কাঠামোয় কোনো অভিযান ঘোষণা করেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য নেই।

বরং বর্তমান প্রস্তুতিকে দেখা যাচ্ছে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমন ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনুমোদন মিললে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে এই প্রস্তুতির বাস্তব প্রয়োগ শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

রাজধানীর অপরাধ দমনে এখন বড় প্রশ্ন শুধু ‘কতজন অপরাধী ধরা পড়বে’—তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠের অপরাধী থেকে শুরু করে অর্থদাতা ও নির্দেশদাতা পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্ককে কতটা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। সেই জায়গাতেই আসন্ন আইনশৃঙ্খলা তৎপরতার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
এমআর