সরিষায় সোনালি স্বপ্ন:
হারুন অর রশীদের পরিকল্পনায় বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ কৃষকের ভাগ্য
শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে গ্রামবাংলার মাঠে যখন ফুটে ওঠে হলুদ সরিষার ফুল, বিকেলের হিমেল হাওয়ায় দোল খেতে থাকে ফুলের সমারোহ, ফুলের ঘ্রাণে মৌমাছি এক ফুল থেকে অন্য ফুলে মধু সংগ্রহ করে, প্রজাতির ডানা মেলে উড়তে থাকে। তখন সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একজন কৃষকের সংগ্রাম, আশা ও সাফল্যের গল্প। তেমনই এক গল্পের নায়ক খুলনা পাইকগাছা উপজেলার হরিঢালী ইউনিয়নের মালত গ্রামের মৃত শাহাজুদ্দীন গাজী ছেলে হারুন অর রশিদ। পরিকল্পিত সরিষা চাষের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখনো সম্ভাবনার শেষ হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে হারুন অর রশিদের জীবিকা ছিল মাছ চাষ ও ধান চাষনির্ভর। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সারের মূল্য ঊর্ধ্বগতি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ধান চাষ হয়ে পড়ে অলাভজনক। সংসারের ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন। তখনই বিকল্প ফসল চাষের কথা ভাবতে শুরু করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরিষা চাষ সম্পর্কে ধারণা নেন হারুন অর রশিদ। পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ, সঠিকভাবে জমি প্রস্তুত এবং সময়মতো বপনের সিদ্ধান্ত নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার জমিতে সবুজ সরিষার গাছ গজিয়ে ওঠে, যা পরে রূপ নেয় হলুদ ফুলে ভরা বিস্তীর্ণ মাঠে।
হারুন অর রশিদ উপজেলার হিতামপুর মৌজায় বোয়ালিয়া ব্রিজসংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের তীরে ৭০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে সরিষা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য বছরে লিজ দিতে হয় ১১ হাজার টাকা। তিনি মোট ৫০ কেজি বীজ বপন করেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) এর আঞ্চলিক কেন্দ্র, বিনেরপোতা, সাতক্ষীরা থেকে ৫০ কেজি বীজ সহায়তা হিসেবে পান।
তিনি জানান, সরিষা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সেচ ও কীটনাশকের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় সীমিত থাকে। নিয়মিত পরিচর্যা ও সময়মতো সার প্রয়োগ করায় রোগবালাইও কম দেখা দিয়েছে। এই ফসল ৮০ থেকে ৮৫ দিনের মধ্যেই কাটার উপযোগী হয়, ফলে অল্প সময়েই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে।
হারুন অর রশিদ বলেন, “আগে ভাবতাম কৃষিকাজ মানেই শুধু কষ্ট। এখন বুঝেছি, সঠিক পরিকল্পনা আর আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে কৃষিকাজ থেকেও সম্মানজনক আয় করা সম্ভব।”
তিনি আরো বলেন এটা কাটার সময় একটি ব্যয়বহুল খরচ হয় এই ৭০ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করে কাটার সময় প্রায় এক লাখ টাকা মতো খরচ হবে।
তার এই সাফল্য ইতোমধ্যে এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আশপাশের অনেক কৃষক সরিষা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং কেউ কেউ পরবর্তী মৌসুমে চাষের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এতে করে এলাকায় নতুন কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হচ্ছে।
সরিষা কাটার পর একই জমিতে আবার মাছ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে হারুন অর রশিদের। তবে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি সহায়তা সময়মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “যদি সময়মতো সার ও বীজ দিয়ে সহযোগিতা করা হতো, তাহলে আমরা আরও লাভবান হতে পারতাম।”
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. একরামুল হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে বৃষ্টির কারণে সরিষা চাষ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “হারুন অর রশিদ বীজ পাচ্ছিলেন না। আমি নিজে বিএআরআই সাতক্ষীরা থেকে বীজ এনে আমার গাড়িতে করে তাকে দিয়েছি। আমরা বীজ উৎপাদন করি না, তবে পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও জানান, সরিষা চাষের জন্য ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী। তাপমাত্রা বেশি হলে ফলনের ক্ষতি হতে পারে।
কৃষি নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে হারুন অর রশিদের এই সাফল্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা—যেখানে সঠিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং পরিশ্রমই পারে একজন কৃষকের জীবনে সোনালি পরিবর্তন আনতে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments