ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিবর্ষণ ও সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত ১০ বছরে এই সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে অন্তত ২৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নির্বিচারে গুলি চালানো এবং বাংলাভাষীদের সীমান্ত দিয়ে পুশ-ব্যাক করার মতো অভিযোগও উঠেছে ভারতীয় এই বাহিনীর বিরুদ্ধে।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবি সুত্রে জানা গেছে, জেলার সঙ্গে ভারতের ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া ছাড়াই উন্মুক্ত রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ অংশে মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর, মান্দারবাড়ীয়া, শ্যামকুড়, নেপা, কাজীরবেড় ও স্বরূপপুর ইউনিয়ন রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা।
বিজিবির তথ্যমতে, মহেশপুরের কাজীরবেড় সীমান্তের বিপরীতে হাবাসপুর ও সুন্দরপুর, বাঘাডাঙ্গা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের বর্ণবাড়ীয়া, শীলবাড়ীয়া, গৌড়া, মাইলবাড়ীয়া সীমান্তের বিপরীতে পাখিউড়া, স্বরুপপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের নোনাগঞ্জ ও বেণীপুর, খোসালপুরের বিপরীতে রামনগর ও কুমারী এবং শ্যামকুঁড় সীমান্তের বিপরীতে ভারতের ছুটিপুর, ফতেপুর ও ভজনঘাট সীমান্তের বিএসএফ ক্যাম্প রয়েছে।
ভারতের সীমান্তে দেশটির ১৪টি বিএসএফ ক্যাম্প গত ১০ বছরে ২৯ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনের নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত ২৯ নভেম্বর ভারতের টুঙ্গি বিএসএফ সদস্যরা শহিদুল নামে এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে। ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পর গত ৬ ডিসেম্বর শহিদুলের লাশ ফেরৎ দেয় বিএসএফ। এর আগে, গত ৩ নভেম্বর মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তে বাউলি গ্রামের আবুল কাসেমের ছেলে আব্দুর রহিমকে ভারতের নদীয়া জেলার ধানতলী থানার হাবাসপুর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যদের গুলি চালিয়ে হত্যা করেন।
বিজিবির তথ্য অনুসারে, গত ১০ বছরে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আলম মিয়া, ওয়াসিম আলী, আব্দুল মান্নান ও আত্তাব আলী; তিন সহোদর ফজলুর রহমান, আবু সালেহ ও লিপু হোসেন; সলেমানপুর গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন ও মিজানুর রহমান; খোসালপুর গ্রামের দুই ভাই সোহেল ও রাশিদুল; মাটিলা গ্রামের আশা মিয়া, হারুন মিয়া ও জসিম উদ্দীন; শ্যামকুড় গ্রামের নাসির উদ্দীন, লেবুতলা গ্রামের লান্টু মিয়া, আমিরুল ইসলাম, আন্টু মিয়া, জলুলী গ্রামের খয়জেল হোসেন, গোপালপুর গ্রামের ওবাইদুর রহমান, যাদবপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম, বাঁকোশপোতা গ্রামের হাসান আলী, বাগাডাঙ্গা জিনজিরাপাড়ার আব্দুল খালেক মিয়া, কাজীরবেড় গ্রামের আশাদুল ইসলাম ও মাইলবাড়িয়া গ্রামের শফিউদ্দিন।
বিজিবির একটি সূত্র দাবি করেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ৫৮ বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের পরে সীমান্ত হত্যা কিছুটা কমেছে। আগে দুরত্বের কারণে সীমান্তে নজরদারি ব্যবস্থা ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। এখন নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে সর্তক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
সীমান্তের একটি সুত্র জানায়, বাংলাদেশিরা অবৈধ পথে ভারতে প্রবেশ করে মাদক, গরু, অস্ত্র ও সোনা পাচার করতে গিয়ে বিএসএফের গুলির মুখে পড়ে। অনেক সময় আবার বাংলাদেশিদের হাতে বিএসএফ সদস্যদের জখম হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
এসব বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল আলম জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনীর অনমনীয়তার কারণেই সীমান্ত হত্যা বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হলেই কেবল সীমান্ত হত্যা রোধ করা সম্ভব।
কাজীরবেড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইয়ানবী জানান, সীমান্তের ভারতীয় অংশে প্রতি কিলোমিটারে একটি করে বিএসএফ ক্যাম্প রয়েছে। অথচ সেখানে বাংলাদেশের আছে প্রতি ৪ কিলোমিটারে একটি। অনেকসময় বাংলাদেশিরা ভুল করে সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করলেই বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, সীমান্ত হত্যা ও সীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবি বরাবরই শক্ত অবস্থানে আছে। তারা নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও সীমান্ত এলাকার মাননুষকে সচেতন করে সীমান্ত হত্যা বহুলাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে আগের চেয়ে এখন সীমান্তের পরিস্থিতি অনেক ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।




Comments