Image description

মোহনার শরীরের কিছু ক্ষত শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু দাগগুলো যেন কথা বলে। আবার কিছু আঘাত এখনও দগদগে। গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অষ্টম তলার সার্জারি বিভাগের ৩ নম্বর বেডে শুয়ে আছে ১১ বছরের শিশুটি। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা এই শিশুর চোখে মুখে শুধু ব্যথা নয়, জমে আছে অজানা এক আতঙ্ক। কারও পায়ের শব্দ পেলেই সে চমকে ওঠে, চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, ভয় যেন এখনও তাকে তাড়া করে ফেরে।

উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের সি/৭ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর বাড়িতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়া মোহনার চিকিৎসা চলছে গাজীপুরের এই হাসপাতালে। চিকিৎসকরা বলছেন, তাঁর শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘদিনের, নিয়মিত ও পরিকল্পিত নির্যাতনের প্রমাণ বহন করে। সেরে উঠতে সময় লাগবে-শুধু শরীর নয়, মনও।

হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. খলিলুর রহমান বলেন, শিশুটির হাতে, পায়ে, পিঠে-রুটিন মাফিক মারধরের চিহ্ন রয়েছে। কোনো আঘাত ১০ দিনের, কোনোটি ১৫ দিনের, আবার কোনোটি ২০ দিনের পুরোনো। তাকে পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হয়নি। পুরোপুরি সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে মোহনার কণ্ঠ বারবার আটকে আসে। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে সে জানায়, বাড়ির মালিকের স্ত্রী বিথীকে আমি মা বলে ডাকতাম। কিন্তু মা-ই আমাকে মারত। খুন্তি গরম করে শরীরে ছ্যাঁকা দিত। চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলত। আমাকে স্যারের কাছে যেতে দিত না। প্রায়ই বাথরুমে আটকে রাখত। খেতে দিত না। খুব ক্ষুধা লাগলেও ভয়ে খাবার চাইতে পারতাম না। এখনও ১১ বছর পূরণ হয়নি মোহনার। মোহনা মা-হারা শিশু। বয়স যখন এক বছর, তখন সড়ক দুর্ঘটনায় মাকে হারায় সে। মেয়ের কথা ভেবেই বাবা গোলাম মোস্তফা আর বিয়ে করেননি। হোটেলে কাজ করে সংসার চালাতেন। তারা থাকতেন গাজীপুরের জরুন এলাকায়।

গত কোরবানির ঈদের পর মোহনাকে ওই বাড়িতে কাজে দেন গোলাম মোস্তফা। সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে মোহনার কাঁধে।

গোলাম মোস্তফা বলেন, মাঝে মধ্যে মেয়েকে দেখতে যেতাম, ফোনেও কথা হতো। কিন্তু গত দুই মাস আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি। নানা অজুহাতে বাসায় যেতে বারণ করত। গত শনিবার রাতে মেয়েকে দেখতে গিয়ে তিনি যা দেখেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আদরের মেয়ের ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে সেখানেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। রাত ২টার দিকে মেয়েকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।

তিনি আরও জানান, সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েটাকে আমার কাছে দিয়েছে। কাউকে কিছু না জানাতে ভয়ভীতি দেখানো হয়। মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় গোলাম মোস্তফা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী রহমানসহ চারজনকে আসামি করে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। 

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক এস কে ফরহাদ জানান, শিশুটির চিকিৎসা চলছে। আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও অনেক সময় লাগবে।