স্বর্ণের দামে আগুন: কটিয়াদীতে ক্রেতাশূন্য জুয়েলারি দোকান, বিপাকে ব্যবসায়ী ও কারিগররা
স্বর্ণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী বাজারে দেখা দিয়েছে চরম মন্দা। ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে অধিকাংশ জুয়েলারি দোকান। বিক্রি কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কাজ না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন শতাধিক স্বর্ণশিল্পী (কারিগর)।
সরেজমিনে কটিয়াদী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানে বসে ক্রেতার অপেক্ষায় সময় পার করছেন বিক্রেতারা। দিনে দু-একজন ক্রেতা এলেও দাম শুনে বেশিরভাগই ফিরে যাচ্ছেন। গত ৩ মার্চ মঙ্গলবার সকালে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সোনা।
ক্রেতারা জানান, আগে প্রয়োজন ও শখ দুই কারণেই মানুষ স্বর্ণ কিনতেন। এখন দামের চাপে প্রয়োজনেও কিনতে পারছেন না অনেকে। আত্মীয়-স্বজনের অনুষ্ঠানে স্বর্ণ উপহার দেওয়ার প্রচলনও কমে গেছে।
স্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে একটি আংটি কিনতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যান শাহাদাত ভূইয়া। তিনি বলেন, “শখের বশেই একটি আংটি কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু দাম শুনে মাসিক খরচের হিসাব মিলিয়ে কিনতে পারলাম না।”
লোহাজুরী থেকে আসা ইসরাত জাহান মীম বলেন, “আগে একটি নাকফুলের দাম ছিল এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এখন সেটি কিনতে চার হাজার টাকা লাগছে। শখের কেনাকাটা তো দূরের কথা, প্রয়োজনেও সম্ভব হচ্ছে না।”
এদিকে ক্রেতা কমে যাওয়ায় কাজের পরিমাণও কমে গেছে। স্বর্ণালঙ্কার কারিগররা মূলত জুয়েলারি দোকানের অর্ডারভিত্তিক কাজ করেন। কেউ গড়িত, কেউ সিলা, কেউ নকশা বা সেটিংয়ের কাজ করেন। তারা বেতনভুক্ত নন কাজ করলেই মজুরি পান। কিন্তু দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কাজ প্রায় বন্ধ।
কটিয়াদী উপজেলার শতাধিক কারিগর এখন অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। কাজ না থাকায় অনেকেই পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন।
কারিগর ও ছোট দোকানদার তনু মীর বলেন, “আগে মাসে ১০ থেকে ২০ ভরি স্বর্ণের কাজ করতাম। এখন তিন-চার ভরির কাজও জোটে না। আগে ২০-৩০ হাজার টাকা আয় হতো, এখন ১০ হাজার টাকাও হয় না।”
কারখানার কারিগর অসীম জানান, “কাজ না থাকায় পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। ঈদের আগেও কাজ বাড়েনি। এখন ভাবছি পেশা ছেড়ে অটোরিকশা বা সিএনজি চালাব।”
কটিয়াদী বাজারের প্রিন্সেস জুয়েলার্সের মালিক বাবুল মীর বলেন, “সোনার কাজ নেই, তাই বেচাকেনাও নেই। এত দাম দিয়ে কে শখ পূরণ করবে? অনেক দিন দোকানে বউনি হয় না।”
তিনি আরও জানান, মাঝেমধ্যে কেউ নাকফুল বা শিশুদের আংটি কিনতে আসেন। কিছু ক্রেতা পুরোনো গহনা পরিষ্কার করতে দেন। তবে নতুন অর্ডার নেই বললেই চলে। কাজ দিতে না পারায় অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যা”েছন।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু কারিগর নয়, দোকান মালিক ও মহাজনেরাও একসময় দেউলিয়া হয়ে পড়বেন। স্বর্ণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কটিয়াদীর স্বর্ণবাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।




Comments