Image description

প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার প্রথম বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের ক্ষেত্রে তাঁর বিখ্যাত “তোমাকে বরখাস্ত করা হলো” বাক্যটি ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু এই বছর ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের টালমাটাল অবস্থা। এই অবস্থায় সামনে আরও অনেক পরিবর্তন আসছে বলে মনে হচ্ছে।

এনবিসির এক প্রতিবদনে বলা হয়েছে, এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সচিব ক্রিস্টি নোম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে অপসারণ করেছেন। এই রদবদল এই সম্ভাবনাকে আরো জোরালো করেছে। নিজের শীর্ষ নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে স্থিতিশীলতা প্রদর্শনের যে আকাঙ্ক্ষা প্রেসিডেন্টের ছিল, তা হয়তো শেষ হয়ে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন আসতে চলেছে।

ট্রাম্পের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত এক ব্যক্তি বলেছেন, “আমি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিছু একটা আশা করছি এবং প্রেসিডেন্ট পরিবর্তন ও পুনর্গঠন উভয় বিষয় নিয়েই ভাবছেন।” 

তিনি আরও যোগ করেন যে, পরবর্তী ব্যক্তি কে হতে পারেন, তা তিনি জানেন না।

অবশ্য, কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়, এবং যারা তার সুনজরে আছে তারা হঠাৎ করেই বাদ পড়ে যেতে পারে, আবার এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে।

এটি ট্রাম্পের আগের মেয়াদ থেকে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন। তখন, তাঁর ক্ষমতায় থাকার প্রথম বছরেই প্রশাসনের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা সচিব টম প্রাইস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অফ স্টাফ রেইন্স প্রিবাস।

এবার প্রশাসনের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা বড় ধরনের কেলেঙ্কারি বা ভুলের সম্মুখীন হলেও ট্রাম্প তাদের অপসারণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্পের এক মিত্র বলেন, “প্রথম বছর উচ্চ-পর্যায়ের কর্মীদের ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক ভাবমূর্তি এড়াতে চেয়েছিল, তবে সেই পর্ব শেষ হচ্ছে। ভাবমূর্তির বিষয়টি নিয়ে তিনি আর চিন্তিত বলে মনে হয় না।”

যারা জনবিতর্ক বা ভুল পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তাদের মধ্যে রয়েছেন শ্রম দপ্তরের সচিব লরি শাভেজ-ডেরেমার, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড এবং বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক, যাদের প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি বা তাদের সংস্থার নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য কমবেশি জনরোষের শিকার হয়েছেন।

জেফরি এপস্টাইন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া লুটনিককে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করা হয়েছে যে, কেন প্রয়াত সাজাপ্রাপ্ত যৌন অপরাধীর নথিতে তার নাম একাধিকবার রয়েছে এবং কেন তিনি তার ব্যক্তিগত দ্বীপে গিয়েছিলেন। লুটনিক বলেছেন, “তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না।”

লুটনিকের অবস্থান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, “তার অবস্থা মাঝে মাঝেই টালমাটাল ছিল।”

উপদেষ্টা বলেছেন যে তিনি হোয়াইট হাউসের চিফ অফ স্টাফ সুসি ওয়াইলসেরও সুনজর হারিয়েছেন।

হোয়াইট হাউসের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত ট্রাম্পের আরেকজন মিত্র বলেছেন “আমার মনে হয় না তিনি এর খুব বড় ভক্ত, প্রশাসন যদি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকে, তবে এটি একটি সমস্যা হতে পারে।”

হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে, ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন।

“আমেরিকার ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্ত্রিসভা ও দল সবচেয়ে প্রতিভাবান,” বলেছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গেল। “ডিএনআই গ্যাবার্ড, সেক্রেটারি লুটনিক এবং সেক্রেটারি শ্যাভেজ-ডিরেমারের মতো দেশপ্রেমিকরা প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি অক্লান্তভাবে বাস্তবায়ন করছেন এবং আমেরিকান জনগণের জন্য অসাধারণ ফলাফল অর্জন করছেন। প্রেসিডেন্টের পূর্ণ আস্থা তাদের ওপর অব্যাহত রয়েছে।”

লুটনিক, গ্যাবার্ড এবং শাভেজ-ডিরেমারের মুখপাত্ররা মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।

এই দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদের প্রথম বছর যেন প্রশাসনিক রদবদলের শিরোনামে ছেয়ে না যায়, এই ধারণার পেছনে ওয়াইলস ছিলেন মূল চালিকাশক্তি, কিন্তু শীর্ষ কর্মকর্তাদের সেই হিসাব-নিকাশ এরপর থেকে বদলে গেছে।

“সুজি যতদিন সম্ভব ব্যাপারটা ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু একবার অ্যাটর্নি জেনারেলকে পদচ্যুত করলে, আরও দু-একজনের ক্ষেত্রেও তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থা নেওয়াই ভালো,” ট্রাম্পের এক মিত্র বলেন।

কেউ কেউ এই সময়টিকে—প্রশাসনের এক বছরেরও বেশি সময় পর—পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক মুহূর্ত এবং এই ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন যে, ট্রাম্প যখনই প্রয়োজন মনে করবেন, তখনই নীতি পরিবর্তনে ইচ্ছুক।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের একজন প্রাক্তন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “দেড় বছর হয়ে গেছে, এবং তারা বিশ্লেষণ করছেন কী কাজ করছে আর কী করছে না। তিনি বোঝেন যে এমন সময় আসে যখন পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়।”

তিনি বলেন, “তিনি একজন কড়া বস,” লোকটি আরও বলল। “সবসময় তাঁর প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে।”

অন্যরা বলছেন যে, যদি আরও রদবদল হয় — প্রেসিডেন্ট তো প্রতিযোগীদের বরখাস্ত করার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হিসেবে সুপরিচিত — তবে তা ট্রাম্পের পুরনো স্বরূপে ফিরে আসা।

প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনে কাজ করা রিপাবলিকান পরামর্শক ম্যাথিউ বারলেট বলেন, “এখন মন্ত্রিসভার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করাটা একটা রিয়েলিটি টিভি শোর মতো—তবে এটা ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’-এর চেয়ে ‘সারভাইভার’-এর মতো বেশি হতে পারে। সরকারি চাকরিতে ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং জনদায়বদ্ধতা অপরিহার্য, কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য এবং হতাশার প্রকাশ বলেই মনে হচ্ছে।”

নভেম্বরের নির্বাচনের আগে রদবদলের আরেকটি বাড়তি সুবিধা হলো সিনেটে এক ধরনের নিশ্চয়তা পাওয়া, যেখানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং ট্রাম্পের মনোনীতদের অনুমোদন দেওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি। নভেম্বরের পর পর্যন্ত নতুন কর্মকর্তাদের আনার জন্য অপেক্ষা করলে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতায় আসা, অথবা রিপাবলিকানদের সামান্য ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।

পুলিশ ইউনিয়নের সদস্যদের উপস্থিতিতে ন্যাশভিলের একটি অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেওয়ার ঠিক আগে ট্রাম্প একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে নোয়েমের ডিএইচএস ছাড়ার ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, নোয়েম করদাতাদের অর্থে নির্মিত ২২০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিজ্ঞাপনে অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশত্যাগে উৎসাহিত করার জন্য ব্যাপক সমালোচনা ও কংগ্রেসীয় তদন্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন ।

প্রশাসনের এক কর্মকর্তার মতে, এর কয়েক সপ্তাহ পরে, বুধবার সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পথে একই গাড়িবহরে থাকাকালীন ট্রাম্প বন্ডিকে জানান যে তার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে , কিন্তু সেই কথোপকথনে তারা সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা চূড়ান্ত করেননি। 

ওই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি অমীমাংসিত রাখা হয়েছিল এবং বন্ডি ভেবেছিলেন যে তিনি হয়তো তখনও তার চাকরি বাঁচাতে পারবেন।

পরদিন ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নোয়েম ও বন্ডির বরখাস্তের ঘটনাকে “সম্পূর্ণ পৃথক পরিস্থিতি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্প কয়েক মাস ধরেই বন্ডিকে বরখাস্ত করার কথা ভাবছিলেন, অপরদিকে নোয়েমকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তটি আরও দ্রুত নেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, এপস্টাইন ফাইলগুলো সামলানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা এবং রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করতে বিচার বিভাগের ব্যর্থতার কারণে বন্ডি সময়ের সাথে সাথে ট্রাম্প ও তার মিত্রদের আস্থা হারিয়েছিলেন, যেমনটি এনবিসি নিউজ পূর্বে জানিয়েছিল ।

নোয়েম ও বন্ডির বিদায়ের পর ট্রাম্প তাদের প্রশংসা করেন। তিনি নোয়েমকে নবগঠিত ‘শিল্ড অফ আমেরিকাস’-এর প্রধান হিসেবে প্রশাসনের অন্য একটি পদে স্থানান্তর করেন এবং বন্ডিকে ‘ মহান আমেরিকান দেশপ্রেমিক ’ বলে অভিহিত করেন। 

বন্ডি জানান, তিনি বেসরকারি খাতে যোগ দেবেন ।

কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সের চেয়ারম্যান ম্যাট শ্ল্যাপ গত সপ্তাহে টেক্সাসে দলটির বার্ষিক সভায় মঞ্চে তৎকালীন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। বন্ডিকে বরখাস্ত করার এবং ব্লাঞ্চ ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার কয়েকদিন আগেই এই ঘটনা ঘটেছিল।

শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে শ্ল্যাপ বলেন, তিনি ব্লাঞ্চকে আগেই এই সমালোচনার কথা জানিয়েছিলেন যে, বিচার বিভাগ জো বাইডেনের প্রশাসনকে তার ভাষায় “সুস্পষ্ট অন্যায়ের” জন্য জবাবদিহি করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।

শ্ল্যাপের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ব্লাঞ্চ তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি “কঠিন প্রশ্ন”কে স্বাগত জানান এবং “ভালো উত্তর” দিতে প্রস্তুত আছেন।

শ্ল্যাপ এনবিসি নিউজকে বলেন, “তিনি অবশ্যই অবগত ছিলেন যে লোকেরা বলছে, ‘আরে, সাবেক বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে এত দেরি হচ্ছে কেন’।”

কিন্তু সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মতে , বিচার বিভাগে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও মামলাগুলো হয়তো ট্রাম্প যতটা চাইছেন ততটা সফল হবে না—কারণ সেগুলো এমন সব তথ্য, আইন ও প্রমাণের সম্মুখীন হবে যা কার্যকর ফৌজদারি মামলাকে সমর্থন করে না।

শ্রম বিভাগের প্রধান শাভেজ-ডিরেমার জনরোষের মুখে পড়েছেন, কারণ তার স্বামীকে নারী কর্মীদের যৌন নিপীড়ণ অভিযোগের পর দপ্তরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যদিও ডিসি পুলিশ কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত বন্ধ করেছে, শাভেজ-ডিরেমারের দুজন সহযোগী অভ্যন্তরীণ তদন্তের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন। শাভেজ-ডিরেমার নিজে অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাট হিসেবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা গ্যাবার্ড ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রসঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানসহ ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন, এবং গত মাসে তার একজন শীর্ষ ডেপুটি পদত্যাগ করেছেন। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটিতে তিনি বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “আসন্ন হুমকি” কি না, তা নির্ধারণ করা তার কাজ নয়।

এই সম্ভাব্য রদবদল এমন সময় হচ্ছে যখন রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে উভয় কক্ষে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। জিওপি-র এক কর্মকর্তা মনে করেন, মন্ত্রিসভার এই রদবদলগুলো মানুষকে অস্থায়ী উত্তেজনায় রাখলেও, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি সাধারণত মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করবে।