পাকিস্তান নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী নাকি মার্কিন স্বার্থের বাহক, তা নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি দায়িত্বশীল শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাকিস্তানের প্রচেষ্টা এখন গভীর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পাকিস্তানে আলোচনা করার সিদ্ধান্তকে ‘কৌশলগত ভুল’ হিসেবে অভিহিত করায় ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
ইরানি আইনপ্রণেতার বিস্ফোরক মন্তব্য:
ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির সদস্য মাহমুদ নাভাবিয়ান সম্প্রতি এসএনএন টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) বলেন, “পাকিস্তানে পারমাণবিক ইস্যুটি আলোচনার টেবিলে আনা একটি কৌশলগত ভুল ছিল। এর ফলে শত্রুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইসলামাবাদ বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতা পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে নিজেকে একটি কেন্দ্রীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয়ভাবে তুলে ধরছে। কিন্তু প্রস্তাবিত পরবর্তী দফার আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি ইরান এখনো নিশ্চিত না করায় এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করায়, পরিস্থিতিটি ক্রমশ একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করছে: পাকিস্তান কি এই সংকটে মধ্যস্থতা করছে, নাকি ভূ-রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টায় কেবল নিজের ভূমিকা অতিরঞ্জিত করছে?
ইরান ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, নাভাবিয়ান বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং ২০ বছরের জন্য তা আটকে দেওয়ার দাবি করেছিল, যে দাবি তেহরান মেনে নেয়নি।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষার সম্মুখীন:
এমন এক সময়ে যখন যুদ্ধবিরতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নিজেকে একটি নিরপেক্ষ সেতু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তার অভাবে ইসলামাবাদ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে, এবং তাদের কূটনৈতিক তৎপরতার দাবি কোনো ফলপ্রসূ ফলাফলে রূপান্তরিত হচ্ছে না।
তেহরানের নীরবতা একটি বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে ইসলামাবাদের দাবিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ২১ ঘণ্টার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সংশয় আরও বেড়েছে, এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূল মতবিরোধগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
'দ্বৈত খেলা' সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং মধ্যস্থতা প্রশ্নবিদ্ধ:
সমালোচনা এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেরেমি স্কাহিল প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তান আদৌ কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কি না।
“আমরা যা দেখছি তা হলো কালক্ষেপণের এক নিপুণ দৃষ্টান্ত,” সাম্প্রতিক এক সম্প্রচারে স্কাহিল বলেন। “পাকিস্তান নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ থেকে শুরু করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যন্ত প্রতিটি ‘প্রতিশ্রুত ফলাফল’ মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ ত্যাগ করার মুহূর্তেই যেন উবে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “এতে প্রশ্ন ওঠে: পাকিস্তান কি শান্তির মধ্যস্থতা করছে, নাকি ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে ইরানের পতনকে পরিচালনা করছে?”
ইরানি কর্মকর্তারাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অসংগতিপূর্ণ আচরণ’ এবং ‘দ্বৈত খেলা’র অভিযোগ তুলেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, মধ্যস্থতাকারীর আন্তরিকতা ছাড়া এ ধরনের সংবেদনশীল আলোচনা সফল হওয়া অসম্ভব। তার মতে, পাকিস্তান আমেরিকান পক্ষের ‘অতিরিক্ত দাবি’ পূরণে সহায়তা করছে বলে তেহরান মনে করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আইআরআইবি-কে বলেছেন , “আমরা সদিচ্ছা নিয়েই আলোচনায় প্রবেশ করেছি, কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করে মধ্যস্থতাকারীর আন্তরিকতার ওপর, যিনি সঠিকভাবে অবস্থানগুলো তুলে ধরবেন, আমেরিকান পক্ষের ‘অতিরিক্ত দাবি’ পূরণে সহায়তা করবেন না।”
কেন পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে:
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার সাথে এমন কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা উপেক্ষা করা কঠিন। ইরান ও আফগানিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে এর নিজস্ব উত্তেজনা রয়েছে, অন্যদিকে এর পররাষ্ট্রনীতিও সামরিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে থাকে।
এর অর্থনৈতিক দুর্বলতা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা এবং জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, দেশটির তেলের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি এবং প্রায় সমস্ত এলএনজি সরবরাহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশে অনুভূত হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ পড়ায়, শুধুমাত্র ব্যবহার সামাল দিতে সরকারকে কর্মদিবস কমাতে এবং এমনকি সময়ে সময়ে স্কুলও বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
ভূগোল এই জরুরি অবস্থার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের সাথে পাকিস্তানের একটি দীর্ঘ ও সংবেদনশীল সীমান্ত রয়েছে, যার অর্থ হলো যেকোনো উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনো দূরবর্তী সংকট নয়, বরং এমন কিছু যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সমস্যার কাছাকাছি থাকলেই ইসলামাবাদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন বিশ্বাসযোগ্য সমস্যা সমাধানকারী হয়ে ওঠে না।
সব মিলিয়ে, এই চাপগুলো থেকে বোঝা যায় যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা শুধু কৌশল নয়, বরং বাধ্যবাধকতাও বটে। বড় মাপের আলোচনা আয়োজন করলে হয়তো মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং বাস্তবে কাজ করে দেখানোর মধ্যেকার ব্যবধানটা সহজেই চোখে পড়ে।
যদিও পাকিস্তান ইসলামাবাদ আলোচনাকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ফিরে আসার একটি উপায় হিসেবে দেখছিল, পাশাপাশি তারা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতার কিছুটা পুনরুদ্ধার করারও আশা করছিল। একই সময়ে, তারা মার্কিন প্রশাসনের সুনজরে ফিরতে এবং ভারতের বিরুদ্ধে সুবিধা আদায়ে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছিল।
এখন ইসলামাবাদ উভয় সংকটে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়কেই ভিন্ন পথে চালিত করার তার এই কৌশলগুলোর সমালোচনা করছে ইরানি নেতৃত্বের একাংশ।
প্রাসঙ্গিকতা অর্জনের প্রচেষ্টা, নাকি উন্মোচিত সীমাবদ্ধতা?
আপাতত, পাকিস্তানের শান্তি প্রস্তাব মার্কিন চাপ, ইরানের অবিশ্বাস এবং বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরার নিজস্ব প্রয়োজনের মাঝে আটকা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ইসলামাবাদ আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর পরিবর্তে যা সামনে আসছে তা হলো, ফলাফল আটকে যাওয়া, পরস্পরবিরোধী সংকেত এবং ক্রমবর্ধমান সমালোচনার এক ধারা, যা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্পষ্ট করে তুলতে শুরু করেছে।
সূত্র: দি স্টেটসম্যান




Comments