Image description

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের দক্ষিণ কোচাশহর গ্রাম রোববার দিবাগত রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে মুহূর্তেই যেন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হঠাৎ নেমে আসা প্রবল ঝড়, বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির তাণ্ডবে গ্রামটি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। উড়ে গেছে অসংখ্য ঘরের টিনের চাল, ভেঙে পড়েছে কাঁচা বসতঘর, উপড়ে গেছে শত শত গাছ। মাঠজুড়ে নষ্ট হয়েছে কৃষকের পাকা ও আধাপাকা ফসল। আকস্মিক এ দুর্যোগে বহু পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটানোর শঙ্কায় পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রোববার রাতে হঠাৎ করেই আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। শুরুতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা রূপ নেয় ভয়াবহ কালবৈশাখীতে। দমকা হাওয়ার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অনেক টিনের ঘরের চাল কয়েক গজ দূরে গিয়ে পড়ে। কোথাও সম্পূর্ণ ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কোথাও আবার দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকলেও ছাউনি নেই। কয়েক মিনিটের ঝড়েই দক্ষিণ কোচাশহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, এমন ঝড়ের তাণ্ডব তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব কমই দেখেছেন। অনেক পরিবার ঘরের ভেতর থাকা আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রক্ষা করতে পারেনি। ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টির পানিতে ঘরের ভেতরে থাকা চাল-ডাল, কাপড়চোপড়, বিছানাপত্রসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ভিজে নষ্ট হয়েছে। গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেকে। বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

শুধু বসতঘর নয়, এ ঝড়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে কৃষিও। মাঠের বোরো ধান, ভুট্টা, বিভিন্ন সবজি ও মৌসুমি ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কৃষকেরা কয়েক দিনের মধ্যে ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের চোখে এখন হতাশার ছাপ। অনেক জমিতে ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কোথাও গাছ ভেঙে ফসলের ওপর পড়ে আরও ক্ষতি করেছে। এতে সামনে কৃষকের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, দুর্যোগের পরপরই গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক চিত্র সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ ভাঙা ঘরের টিন কুড়িয়ে আনছেন, কেউ উপড়ে পড়া গাছ সরাচ্ছেন, কেউ আবার প্রতিবেশীর মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে ছুটছেন। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে সরকারি সহায়তা ছাড়া অনেক পরিবারের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে পড়বে।

সোমবার (২৭ এপ্রিল)সকালে কোচাশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহরুল হক জাহিদ বলেন, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে দক্ষিণ কোচাশহর গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ক্ষয়ক্ষতির সার্বিক চিত্র সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা, ঘর পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

উত্তরের জনপদ গাইবান্ধায় প্রতিবছরই কালবৈশাখীর তাণ্ডব নতুন করে ক্ষতচিহ্ন এঁকে যায়। তবে প্রতিবারের মতো এবারও প্রকৃতির নির্মম আঘাতের মুখে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ। দক্ষিণ কোচাশহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছ, ছিন্নভিন্ন ঘরবাড়ি আর হতাশ মানুষের দীর্ঘশ্বাস— এই যেন কালবৈশাখীর রেখে যাওয়া নির্মম বাস্তবতা।