ঢাকায় প্রবাসী মোকাররমকে হত্যার পর বিরিয়ানি ভোজ ও ছাদে পার্টি মা ও মেয়ের
রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে হত্যার পর মরদেহ আট টুকরো করে ফেলে রাখার ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক সব তথ্য। পরকীয়া সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকরা বিরিয়ানি ভোজ করেছে এবং বাড়ির ছাদে পার্টিও করেছে। এই ঘটনায় প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৩। তবে পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনা (৩১) এখনো পলাতক রয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে র্যাব-৩ সদরদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানান র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৌদি প্রবাসী মোকাররমের সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা ও সৌদি প্রবাসী সুমনের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সঙ্গে মোকাররমের পরিচয় ও পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অডিও ও ভিডিও কলে কথা বলতেন। প্রবাসে থাকাকালীন তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন মোকাররম।
গত ১৩ মে কাউকে না জানিয়ে মোকাররম দেশে ফেরেন এবং তাসলিমার সঙ্গে দেখা করতে মুগদার মান্ডা এলাকায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা বেগমের ভাড়াবাসায় যান। সেখানে হেলেনা তার দুই মেয়েসহ থাকতেন। ওই রাতে এক রুমের ওই বাসায় মোকাররম, তাসলিমা, হেলেনা ও তার দুই মেয়ে একসঙ্গে অবস্থান করেন।
১৩ মে রাতে মোকাররম ও তাসলিমার মধ্যে বিয়ের বিষয় নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। তাসলিমা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় মোকাররম তার দেওয়া ৫ লাখ টাকা ফেরত চান। একপর্যায়ে মোকাররম হুমকি দেন যে, টাকা না দিলে তাদের মধ্যকার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবেন। এদিকে হেলেনার অভিযোগ, ওই রাতে মোকাররম তার ১৩ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে অসামাজিক আচরণের চেষ্টা করেছিলেন। এসব ঘটনার জেরে হেলেনা ও তাসলিমা মিলে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৪ মে সকালে নাস্তার সঙ্গে মোকাররমকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে হেলেনা তাকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। এসময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মোকাররম হেলেনার হাতে কামড় দেন। তাসলিমা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমকে আঘাত করার চেষ্টা করলে মোকাররম তা কেড়ে নিয়ে উল্টো তাসলিমাকে মারতে যান। ঠিক তখনই হেলেনা বঁটি দিয়ে মোকাররমের গলায় কোপ দেন এবং তার মেজো মেয়ে হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
হত্যার পর মরদেহ বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করা হয়। এরপর মরদেহ আট টুকরো করে পলিথিনে ভরে রাখা হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহের ৭টি টুকরো ভবনের নিচের ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয় এবং মাথাটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অন্য একটি স্থানে ফেলে আসা হয়।
অত্যন্ত বীভৎস বিষয় হলো, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১৫ মে হেলেনা, তার মেয়ে ও পলাতক তাসলিমা একটি হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খান। ওই রাতে তারা বাসায় ফিরে ছাদে পার্টির আয়োজন করেন এবং সেখানে প্রতিবেশীদেরও অংশ নিতে অনুরোধ করেন।
১৭ মে দুপুরে মরদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত দেহাংশ উদ্ধার করে। পরে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে এনআইডি শনাক্ত করে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। র্যাব তদন্ত শুরু করে প্রধান অভিযুক্ত হেলেনা আক্তার ও তার মেয়েকে গ্রেফতার করে। হেলেনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূর থেকে মোকাররমের মাথা উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক জানান, পলাতক তাসলিমা আক্তারকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং এ ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments