গত আট দশক ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের যে সমস্যাটি ঘোর গোলকধাঁধায় ফেলে রেখেছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মাত্র ৩২ ঘণ্টায় তার সমাধান করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের একটি নতুন এআই মডেল কিংবদন্তি গণিতবিদ পল এরদশের উত্থাপন করা বিখ্যাত ‘ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম’ এর সমাধান করেছে। গাণিতিক ইতিহাসের এই মাইলফলককে মানুষের চিন্তাশক্তির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে প্রযুক্তির এক বিশাল জয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী এই ‘ইউনিট ডিস্ট্যান্স প্রবলেম’? ১৯৪৬ সালে প্রখ্যাত হাঙ্গেরীয় গণিতবিদ পল এরদশ এই সমস্যাটি সামনে আনেন। সহজভাবে বললে, একটি সমতলে নির্দিষ্ট সংখ্যক বিন্দু থাকলে তাদের মধ্যে কতগুলো জোড়ার দূরত্ব ঠিক ১ ইউনিট হতে পারে? এরদশ একটি নির্দিষ্ট সীমা অনুমান করেছিলেন, যা গত ৮০ বছর ধরে গাণিতিক ধ্রুবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু ওপেনএআই-এর মডেলটি একটি জটিল গাণিতিক বিন্যাস খুঁজে বের করেছে, যা এরদশের সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। অর্থাৎ, এআই এই ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ‘ডিসপ্রুফ’ বা ভুল প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
স্তব্ধ গণিত বিশ্ব: সাধারণত গাণিতিক প্রমাণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত কঠোর হন। তবে এই সমাধানের পর ফিল্ডস মেডেলজয়ী (গণিতের নোবেল) ফরাসি গণিতবিদ টিমোথি গাওয়ার্স একে ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “কোনো মানুষ যদি এই সমাধানটি লিখে জমা দিতেন, তবে আমি বিনা দ্বিধায় তা প্রকাশের সুপারিশ করতাম। এআই এখন মানুষের জন্য বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠছে।” প্রিন্সটন ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও এআই-এর এই উদ্ভাবনী ক্ষমতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
গবেষকদের মতে, এআই-এর এই সাফল্যের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:
১. প্রথাবিরোধী চিন্তা: মানুষ যেখানে এরদশের তত্ত্ব সত্য প্রমাণে ব্যস্ত ছিল, এআই সেখানে প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে একে ভুল প্রমাণের নতুন পথ খুঁজে নেয়।
২. জ্ঞানের সংমিশ্রণ: এআই একই সাথে ‘বীজগাণিতিক সংখ্যাতত্ত্ব’ ও ‘বিচ্ছিন্ন জ্যামিতি’র ধারণাকে একত্র করতে পেরেছে, যা মানুষের পক্ষে সচরাচর সম্ভব হয় না।
৩. বিরামহীন প্রচেষ্টা: মানুষ ক্লান্ত হলেও এআই হয় না। এই সমাধানের সময় এআই-এর চিন্তাপ্রক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত সংস্করণই ছিল ৭৫ হাজার শব্দের বেশি।
অবিশ্বাস্য কম খরচ ও সময়: যেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে গণিতবিদরা কাজ করেও কূলকিনারা পাননি, সেখানে এআই-এর সময় লেগেছে মাত্র ৩২ ঘণ্টা। আর কম্পিউটিং বাবদ খরচ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ডলারের কম। ওপেনএআই-এর গবেষক মেহতাব সাহনি জানান, শুরুতে তারা নিজেরাও এটি বিশ্বাস করতে পারেননি এবং কয়েক দফা ক্রস-চেক করার পরই নিশ্চিত হয়েছেন যে সমাধানটি শতভাগ সঠিক।
গবেষকরা মনে করছেন, এই সাফল্য প্রমাণ করে যে এআই কেবল চ্যাটবট বা ছবি তৈরির মাধ্যম নয়, বরং উচ্চতর বিজ্ঞানের গবেষণায় এটি মানুষের এক অপরাজেয় সহায়ক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments