Image description

২০২৪ সালের জুলাই মাস।

সকাল থেকেই শহরের পরিবেশ অস্বাভাবিক। কোথাও যানবাহন কম, কোথাও দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক নামানো। তবে শিল্প এলাকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করা রিনা, শিউলি, মমতা আর তাদের সহকর্মীরা এসবের বিস্তারিত খবর জানত না।
তাদের দিন শুরু হয় ভোরে।
কাজে যাওয়া, মেশিনের শব্দ, টার্গেট পূরণ, ওভারটাইম—এই ছিল তাদের পৃথিবী।

সেদিন দুপুরের কিছু আগে হঠাৎ ঘোষণা এলো—
"আজ কারখানা বন্ধ। সবাই বাসায় চলে যান।"
কেউ অবাক হলো।
কেউ খুশি।
কেউ উদ্বিগ্ন।

কারখানার গেট দিয়ে বের হতে হতে শিউলি বলল,
— "হঠাৎ বন্ধ কেন?"
রিনা কাঁধ ঝাঁকাল।
— "জানি না। হয়তো পরিস্থিতির জন্য।"

শ্রমিক মেয়েদের দলটি হেঁটে বাসার দিকে রওনা হলো।
রাস্তার বাতাসে এক ধরনের উত্তেজনা।
দূরে মানুষের কণ্ঠ ভেসে আসছে।
প্রথমে তারা বুঝতে পারেনি।
কিন্তু যত এগোল, শব্দ তত স্পষ্ট হলো।
একটি মিছিল এগিয়ে আসছে।
শত শত মানুষ।
কেউ ব্যানার হাতে।
কেউ পতাকা।
কেউ শুধু খালি হাতে হাঁটছে।
মিছিলের ভেতর থেকে একসঙ্গে স্লোগানের ধ্বনি উঠল।
"লাশের ভিতর জীবন দে..."
তারপর আরও অনেক কণ্ঠ মিলে প্রতিধ্বনি করল।
রাস্তাজুড়ে শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।

রিনা আর তার সহকর্মীরা থমকে দাঁড়াল।
তারা আগে এত বড় মিছিল কাছ থেকে দেখেনি।
মিছিলটি কাছে আসতেই তারা আরেকটি বিষয় খেয়াল করল।
সামনের সারিতে অনেক কলেজপড়ুয়া মেয়ে।
কারও গায়ে সাদা-নীল ড্রেস।
কারও কাঁধে ব্যাগ।
কারও হাতে প্ল্যাকার্ড।
ঘামে ভেজা মুখ, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা।

সামনের সারির একটি মেয়ে রিনাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল।
— "আপুরা, দাঁড়িয়ে থাকবেন না। আসেন।"
রিনা অবাক।
নিজের দিকে আঙুল তুলে বলল,
— "আমরা?"
— "হ্যাঁ, আপনারাই।"
শিউলি দ্বিধায় পড়ে গেল।
— "আমরা তো কাউকে চিনি না।"
কলেজছাত্রীটি হাসল।
— "চেনার দরকার কী? আমরা সবাই তো একই শহরের মানুষ।"

কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
মমতা চারদিকে তাকাল।
রাস্তার দুই পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে।
সামনের মেয়েগুলো ডাকছে।
রিনা ধীরে ধীরে এক পা এগোল।
তারপর আরেক পা।
এরপর মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
শিউলি তার পিছু নিল।
মমতা নিল।
একসময় পুরো শ্রমিকদল মিছিলের সঙ্গে মিশে গেল।

কলেজের এক ছাত্রী নিজের পানির বোতল এগিয়ে দিল।
— "আপু, পানি খাবেন?"
রিনা অবাক হয়ে বোতল নিল।
হেসে বলল,
— "ধন্যবাদ।"
মিছিল এগোতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে কথা শুরু হলো।
একজন কলেজছাত্রী বলল,
— "আপনারা কোথায় কাজ করেন?"
— "গার্মেন্টসে।"
— "কতক্ষণ কাজ করতে হয়?"
— "কখনও দশ ঘণ্টা, কখনও আরও বেশি।"
ছাত্রীটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— "আমরা বইয়ে শ্রমিকদের কথা পড়ি। আজ আপনাদের সঙ্গে হাঁটছি।"
রিনা হেসে উত্তর দিল,
— "আমরাও ছাত্রদের কথা শুনি। আজ একসঙ্গে হাঁটছি।"

বিকেলের সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
রাস্তার উপর লম্বা ছায়া।
কিন্তু মিছিলের ভেতরে যেন নতুন এক শক্তি জন্ম নিয়েছে।
ছাত্রীরা আছে।
শ্রমিক মেয়েরা আছে।
পথচারীরা কেউ কেউ এসে যোগ দিচ্ছে।
একসময় শিউলি বুঝতে পারল, সে আর বাইরের কেউ নয়।
সে এখন মিছিলের অংশ।
তার কণ্ঠও অন্যদের সঙ্গে মিশে গেছে।
সে নিজেও স্লোগানের জবাব দিচ্ছে।


সন্ধ্যার কাছাকাছি মিছিল শেষ হলো।
মানুষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
বিদায়ের সময় কলেজের মেয়েটি রিনার হাত ধরল।
— "আবার দেখা হবে আপু।"
রিনা হেসে বলল,
— "হতে পারে।"
— "আজ ভালো লাগল।"
— "আমারও।"

বাসায় ফেরার পথে রিনা ভাবছিল, সকালে সে শুধু একজন গার্মেন্টস শ্রমিক ছিল, যে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিল।
কিন্তু বিকেলের কয়েক ঘণ্টা তাকে অন্য কিছু শিখিয়েছে।
শিখিয়েছে, কখনও কখনও মানুষ একে অপরকে চেনে না, নামও জানে না।
তবু কোনো একটি মুহূর্তে তারা একই রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে।
আর তখন ছাত্র, শ্রমিক, কলেজপড়ুয়া, কারখানার কর্মী—সব পরিচয়ের ওপরে উঠে আসে একটি সাধারণ পরিচয়।
মানুষ।
আর সেদিন সেই রাস্তায় সবচেয়ে বড় গল্প ছিল সেটাই।

মানবকণ্ঠ/ডিআর