চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাভারের আশুলিয়ায় মানুষ হত্যা ও লাশ পোড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল কাফির পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়টি ছিলো নাটকীয়তায় ভরা। মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে তার নামে তিনটি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে। আর এটি করতে আব্দুল্লাহিল কাফির পরিচয় গোপন করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) মেডিকেলের স্প্রেম্যান সুপার ভাইজার হিসেবে জাল ডকুমেন্ট দিয়ে তার আবেদন জমা নিয়েছেন উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন। তার সহযোগিতা ও নির্দেশে অধিদপ্তরের উর্দ্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে মাত্র ৯ দিনে ৩টি পাসপোর্ট ইস্যু করেন কাফির নামে।
শুধু তাই নয়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নের্তৃত্বাধীন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী ও তার স্বামীকে আত্বগোপনে থাকাবস্থায় পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় এই ইসমাইল গংদের হাত দিয়েই। সাবেক বিচারপতি আওয়ামী দোসর ওবায়দুল হাসানের পাসপোর্টও ইস্যু করেছেন তারা। এভাবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের গোপনে ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যু করে তাদের সুরক্ষা করার মিশন বাস্তবায়ন করেন আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের এসব কর্মকর্তা। বিনিময়ে অবশ্য সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেও ভুলেননি তারা। মানবকণ্ঠের দীর্ঘ অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে সাবেক বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছে। এই অফিস থেকেই সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী ও তার স্বামীর পাসপোর্টের প্রক্রিয়া করা হয়। মোবাইল এলনোরমেন্টের মাধ্যমে ছবি তোলে আনেন কোন প্রকার চিঠি ইস্যু ছাড়াই। অথচ সে সময় প্রধান উপদেষ্টার ছবি আনতে অফিসিয়ালি চিঠি ইস্যু করতে হয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে। সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম করা হয় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাভারের আশুলিয়ায় মানুষ হত্যা ও লাশ পোড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল কাফির পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে।
আব্দুল্লাহিল কাফিকে সাধারণ নাগরিক প্রমাণের জন্য জাল ডকুমেন্টের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্টের মাঝে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে পরপর তিনটি পৃথক পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছে। মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ৪০০০০০১২৩৪৯২৬ ক্রমিকের অরডিনারি আবেদন জমা করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র ১৯১৮২৯২৮১২ এর পরিপেক্ষিতে ২০ আগস্ট পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার ডেট দেওয়া হয়। ওই পাসপোর্ট নম্বর-এ০৮৭৫৭০৪৬। কিন্ত তার সেই পাসপোর্ট ডেলিভারি হওয়ার আগেই ১৮ আগস্ট আরও একটি পাসপোর্টের আবেদন জমা নিয়ো হয়, যার আবেদন পত্র নং-৪০০০০০১২৩৫৪৯২। এই পাসপোর্ট (নম্বর-এ০৮৭০৯৫৫৭) ২১ আগস্ট ডেলিভারি দেওয়া হয় তাকে। ওইদিনই নতুন আরেকটি আবেদন জমা নেন উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন। ওই আবেদন নং-৪০০০০০১২৩১৭৫৫। মাত্র দুইদিন পর ২৩ আগস্ট ডেলিভারি দেওয়া হয় ওই পাসপোর্টটি, যার নম্বর-এ০৮৭১২১২৬। এর পরে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর আব্দুল্লাহিল কাফি নির্বিঘ্নে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইমিগ্রেশনে আটকে যান তিনি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশত্যাগের সময় তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর আশুলিয়া ও হাজারীবাগ থানার বিভিন্ন মামলায় তাকে কয়েক দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়।
জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাভারের আশুলিয়ায় মানুষ হত্যা ও লাশ পোড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হলেন আব্দুল্লাহিল কাফি। সে সময় তিনি ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানা এলাকায় শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যা এবং পরবর্তীতে পুলিশের ভ্যানে লাশের ওপর লাশ স্তূপ করে পুড়িয়ে ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা লাশের ওপর লাশের স্তূপ তৈরি করছে, যা ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে পুলিশি নৃশংসতার অন্যতম প্রতীকী দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পিএস মালেকের ভাগ্নি জামাই। একজন উপপরিচালক হয়েও তিনি বসে আছেন পরিচালকের চেয়ারে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি পোস্টিং বানিজ্য ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সে সময় স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের পিএস মনিরের সঙ্গে ছিল গলায় গলায় ভাব। সে সুবাদে তদ্বির বাণিজ্য করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। মন্ত্রীপুত্র জোতির সাথেও ছিল তার একান্ত সম্পর্ক। যার সুবাদে তিনি সে সময় থেকে অধিদপ্তরের আওয়ামীঘেষা কর্মকর্তাদের কাছে প্রিয় পাত্রতে পরিনত হন। অনুসন্ধানে তার নিজ নামে ও বেনামে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে ফ্ল্যাট, প্লট, জমির শেয়ারসহ বিপুল পরিমান সম্পদ পাওয়া গেছে। ব্যাংক হিসাবেও রয়েছে গড়মিল। আয়কর রিটার্নের সঙ্গে নেই কোন মিল।
এ বিষয়ে ইসমাইল হোসেনের কাছে স্বাক্ষাৎ করে তার বক্তব্য জানার জন্য গেলে তিনি দেখা করেননি। তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ‘আমার পিএস’র কাছে প্রশ্ন রেখে যান, আমি পরে উত্তর দিবো।’ তার পিএস’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘স্যার বলেছেন আপনি লিখিত প্রশ্ন দিয়ে যান, আমরা আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিবো।’
মানবকণ্ঠের পক্ষ থেকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় প্রশ্নগুলো রিসিভ করে রাখা হবে কিনা, উত্তরে তিনি বলেন ‘না’। এরপর মানবকণ্ঠের পক্ষ থেকে বলা হয়, রিসিভ না করলে প্রশ্ন জমা দেয়ার বিষয়ে কোনো প্রমাণ কিভাবে সংরক্ষিত হবে? উত্তরে পিএস বলেন, ‘আমি বেশি কিছু বলতে পারবো না। আপনার ইচ্ছা হলে প্রশ্ন লিখে দিতে পারেন, নয়তো নাও দিতে পারেন।’




Comments