Image description

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের করিডোরে একটি নাম ছিল সবার মুখে মুখে—ফারিহা তাবাসসুম। কঠিন সমীকরণ, বিমূর্ত তত্ত্ব কিংবা গবেষণার জটিল বিষয়, সবকিছুতেই তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা। শিক্ষকরা বলতেন, "ফারিহা শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থী নয়, সে একদিন এই বিভাগের গর্ব হবে।"

চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময় থেকেই সবাই জানত, পাস করার পর বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী সে-ই। ফলাফল, গবেষণা, উপস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই ছিল তার অনন্য সাফল্য। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের পরিস্থিতি বদলে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা দাবিতে আন্দোলনে নামল। ক্যাম্পাসে সভা, মিছিল, আলোচনা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল ফারিহা। তার স্পষ্ট বক্তব্য, সাহসী নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক দক্ষতা অনেককে অনুপ্রাণিত করত। এক বিকেলে সহপাঠীরা তাকে বলেছিল, "ফারিহা, একটু সাবধানে থেকো।" সে মুচকি হেসে বলেছিল, "যদি সবাই ভয় পায়, তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে?"

আন্দোলন যত এগোতে লাগল, পরিস্থিতি তত উত্তপ্ত হতে থাকল। এক রাতে, গভীর ঘুমের মধ্যে দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দে জেগে ওঠে তার পরিবার। বাইরে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ফারিহাকে নিয়ে যাওয়া হলো। পরিবারের সদস্যরা কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না।

ভোরের আলো ফোটার আগেই তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তার একটি পা বাঁচানো সম্ভব হলো না। সংক্রমণ ও জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলতে হয়। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে যখন সে প্রথম নিজের শূন্য পায়ের দিকে তাকিয়েছিল, তখন তার চোখে জল এসেছিল। একজন গণিতবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণীর কাছে জীবন যেন হঠাৎ থমকে গিয়েছিল।

কিন্তু সে হার মানেনি। পুনর্বাসনের দীর্ঘ সময়জুড়ে সে আবার বই হাতে তুলে নেয়। কৃত্রিম পা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেয়। গবেষণার কাজ চালিয়ে যায়। সহপাঠীরা যখন তাকে দেখতে আসত, সে বলত, "আমার একটি পা হারিয়েছে, কিন্তু আমার স্বপ্ন হারায়নি।"

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের অধ্যায় শেষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করে। সেই বছর শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো। সাক্ষাতকারের দিন ফারিহা লাঠির সহায়তায় বোর্ডরুমে প্রবেশ করল। উপস্থিত শিক্ষকরা তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন গভীর শ্রদ্ধার চোখে।

কিছুদিন পর ফলাফল প্রকাশিত হলো। গণিত বিভাগের নতুন প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেল ফারিহা তাবাসসুম। প্রথম ক্লাসের দিন বিভাগের সামনে অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখা গেল। শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই শ্রেণিকক্ষ ভরে অপেক্ষা করছে। করিডোর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন নতুন শিক্ষক। তিনি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেল। কেউ একজন পেছন থেকে বলল, "জুলাই যোদ্ধা ম্যাডাম আসছেন।"

মুহূর্তেই পুরো কক্ষ করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। ফারিহা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বোর্ডে বড় করে লিখলেন— "গণিত আমাদের শেখায়, সবচেয়ে কঠিন সমস্যারও সমাধান আছে।"

এরপর তিনি শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "জীবনও ঠিক তেমন। কখনও কখনও আমরা অনেক কিছু হারাই। কিন্তু যদি সাহস না হারাই, তাহলে নতুনভাবে শুরু করা যায়।" সেদিনের ক্লাসে গণিতের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শিখেছিল দৃঢ়তা, সাহস এবং স্বপ্নের প্রতি অটল থাকার পাঠ।

বছর কয়েক পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলে সিনিয়ররা একটি বিশেষ গল্প শোনাত। গণিত বিভাগের এক শিক্ষকের গল্প, যিনি প্রতিকূলতার কাছে মাথা নত করেননি। যিনি একটি পা হারিয়েও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। আর যিনি সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এক নামেই— "জুলাই যোদ্ধা ম্যাডাম।"

মানবকণ্ঠ/ডিআর