Image description

ব্যবসা করতে এককালীন দিতে হবে দুই কোটি, আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা। রাজি না হলে সরাসরি হামলা, ভাঙচুর ও বুলেটের মহড়া! এই দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের ভাষায় ‘সমন্বয়’। এই ‘সমন্বয়ের’ খড়গ মাথায় ব্যবসা করতে হচ্ছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের। তাদের দিন কাটছে আতঙ্কে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় চুনোপুঁটিদের গ্রেপ্তার করতে পারলেও মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীরা।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন ও প্রকল্পে চাঁদাবাজি করে এই সন্ত্রাসীরা। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিপক্ষ দমন, হামলা, অস্ত্রবাজি এমনকি হত্যাকালেও ব্যবহার করা হচ্ছে এদের। 

২০০ গ্যাং, নেপথ্যে ৬৪ ‘বড় ভাই’ : চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সূত্র বলছে, গত ছয় বছরে নগরে কমপক্ষে ৫৪৮টি অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা মিলেছে। এই মুহূর্তে নগরে সক্রিয় প্রায় ২০০টি গ্যাং। এদের পেছনে আছে ৬৪ জন প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’ যাদের আশকারায় ফুলেফেঁপে উঠছে সদস্যরা।

ফোনে চাঁদা না দিলে হামলা: গত ১৩ জুলাই দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে সশস্ত্র একদল তরুণ। হামলা, ভাঙচুর শেষে নিয়ে যায় ৩৫ লাখ টাকা। তাদের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলার দুইদিন আগে ডিডিএনের মালিকের মুঠোফোনে কল করেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিল ইমন’। সরাসরি ‘চাঁদা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তিনি। বলেছেন ‘সমন্বয় করে ব্যবসা চালাতে’। তার দাব্তি ব্যবসা করতে হলে দিতে হবে এককালীন দুই কোটি, মাসে মাসে দশ লাখ।

হামলার ঘটনার রাতে চকবাজার থানায় অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে মামলা হয়। এ পর্যন্ত গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ১৩ জন ও র‍্যাব ৯ জনসহ মোট ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ধার হয়েছে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র।

একই কায়দায় একাধিক ঘটনা: ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামীর কুয়াইশ রোডে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। নিজেদের পরিচয় দেয় ‘বড় সাজ্জাদের লোক’ হিসেবে। বড় সাজ্জাদের আসল নাম সাজ্জাদ আলী খান। তিনি চট্টগ্রামের একজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অপরাধজগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। মূলত দেশের বাইরে পলাতক থেকেই তিনি চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং খুনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা্ল পরিচালনা করেন। 

চলতি বছরের ১৪ ডিসেম্বর হামজারবাগে নূর মোহাম্মদের নির্মাণাধীন ভবনে একই কায়দায় হামলা। দাবি ছিল ৫০ লাখ টাকা। না পেয়ে গুলি ছোড়া হয়, মারধর করা হয় শ্রমিকদের। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ছয়টায় চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে গুলি চালানো হয়। সেখানে তখন পুলিশের পাঁচ সদস্য নিরাপত্তায় ছিলেন। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসভবনে গুলির ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশ বলছে, চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এসব হামলা চালায়।

তুচ্ছ ঘটনায় ঝরছে রক্ত: ১২ এপ্রিল চকবাজারের ডিসি রোডে দুই গ্যাংয়ের বিরোধে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ নিহত হন। একটি মোবাইল ছিনতাইকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জের ধরে তাকে মারধর করে নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের গহ্বরে ফেলে দেয়া হয়।

এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাহাড়তলীতে আকাশ দাশকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি গ্যাং। পূর্ববিরোধই কারণ। র‍্যাব দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে, দুজনেরই বয়স ২০ বছর।

যাদের নিয়ে গ্যাং: পুলিশ বলছে,  এসব গ্যাং সদস্যদের অধিকাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। বেকার যুবক, কারখানার শ্রমিক, এমনকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আছেন। 

গ্যাংয়ের ‘হটস্পট’এলাকা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এই গ্যাংয়ের তা্লব চললেও নির্দিষ্ট কিছু এলাকা তাদের ‘হটস্পট’। যারমধ্যে রয়েছে নগরের জামালখান, গণিবেকারি, চকবাজার, বাকলিয়া, হালিশহর, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, বায়েজিদ, হামজারবাগ, আগ্রাবাদ, কোতোয়ালী, চন্দগাঁও, আকবরশাহ, ইপিজেড ও কালুরঘাট ও বহদ্দারহাট। চকবাজারকেন্দ্রিক ‘ফোর জিরো সেভেন’, জামালখানের ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’, হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুরের ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট (এমবিএস)’। এছাড়া ‘পাইথান’, ‘বিগু’, ‘কেবি’, ‘এনএস’ ও ‘ট্রিপল নাইন’ নামের গ্রুপগুলোও তত্পর।

এদিকে সমপ্রতি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলার পর নড়েচড়ে বসেছে তাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। শঙ্কা ছড়িয়েছে অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। সংগঠনটির চট্টগ্রাম শাখার আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার রুবেন্স বলেন, ‘ডিডিএনে হামলার পর এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে এখন ব্যবসা পরিচালনায় ভয় পাচ্ছেন। নতুন করে ব্যবসা করার আগ্রহও হারাচ্ছেন অনেকে।’ জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন ওরফে বুইশ্যা এবং ছোট সাজ্জাদ এরই মধ্যে কারাগারে আছে। ডিডিএন হামলায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।’ সন্ত্রাসী বা অস্ত্রধারী যেই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।’