Image description

ইসলামি জীবন দর্শনে জাকাত কেবল একটি ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং এটি একটি বৈপ্লবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। পবিত্র রমজান মাসে মুমিনরা যখন আত্মশুদ্ধির আমল ও ইবাদতে মশগুল থাকেন, তখন ইসলামের এই ফরজ বিধানটি পালনের মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। ইসলামি শরিয়তে নামাজ যেমন শারীরিক ইবাদত হিসেবে ফরজ, জাকাতও তেমনি আর্থিক ইবাদত হিসেবে সমভাবে আবশ্যিক।

আমাদের সমাজে অনেকেরই একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, জাকাত হলো ধনীদের পক্ষ থেকে গরিবদের প্রতি একটি দয়া বা করুণা। কিন্তু ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো—এটি ধনীর সম্পদে মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত দরিদ্রের 'হক' বা অলঙ্ঘনীয় পাওনা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এরশাদ করেছেন, "এবং তাদের (ধনীদের) সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।" (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ১৯)। এই আয়াতের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, জাকাত প্রদান কোনো দয়া নয়, বরং পাওনাদারের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার নাম।

পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের নির্দেশ এসেছে, যা প্রমাণ করে যে ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুটি ইবাদত অবিচ্ছেদ্য। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, "তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো।" (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৩)। অর্থাৎ একজন মুমিনের ইমানের পূর্ণতার জন্য নামাজের পাশাপাশি জাকাত প্রদানও অপরিহার্য।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাত আদায়ের সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত জোরালোভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি হযরত মুয়াজ (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন, "তুমি তাদের জানিয়ে দাও যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।" (সহিহ বুখারি)। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। ইসলাম চায় না যে সম্পদ কেবল গুটিকতক ধনীর হাতে কুক্ষিগত থাকুক।

জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার রয়েছে। অনেকে মনে করেন রমজান মাসে কিছু সস্তা শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণ করলেই জাকাতের হক আদায় হয়ে যায়। এটি ইসলামের সুমহান শিক্ষার পরিপন্থী। জাকাত দিতে হবে এমনভাবে যেন গ্রহণকারী ব্যক্তি সেই অর্থ দিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারে এবং আগামী বছর তাকে আর জাকাত নিতে না হয়। লোকদেখানো আয়োজন করে কিংবা মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে অপদস্থ করে জাকাত প্রদান করলে মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।

যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও জাকাত আদায়ে অবহেলা করেন, তাদের জন্য পরকালে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। (সুরা তওবা, আয়াত: ৩৪)।

পবিত্র রমজান হলো সহমর্মিতার মাস। এই মাসে একটি ফরজের সওয়াব অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ সম্পদের সঠিক হিসাব করে বছরান্তে আড়াই শতাংশ জাকাত অভাবী আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে বণ্টন করা। যদি সমাজের সকল সচ্ছল মানুষ সঠিকভাবে জাকাত আদায় করত, তবে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও অপরাধ প্রবণতা বহুলাংশে কমে আসত। জাকাত ধনী ও দরিদ্রের মাঝে একটি মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং সমাজকে সুন্দর ও পবিত্র রাখে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর