Image description

সফর মাসের শেষ বুধবার। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে পরিচিত একটি আবেগঘন নাম- আখেরি চাহার শোম্বা। ফারসি ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, আর ‘চাহার শোম্বা’ অর্থ বুধবার। অর্থাৎ, সফর মাসের শেষ বুধবার। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন মুসলিম সমাজে দিনটি একটি বিশেষ স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। কোথাও এদিন কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও দোয়ার আয়োজন হয়; কোথাও দরিদ্রদের খাবার দেওয়া হয়; কোথাও নফল ইবাদতের আয়োজন করা হয়। আবার কোথাও প্রচলিত হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু নামাজ, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ ও বিশেষ আমলের রীতি। সময়ের স্রোতে একটি দিনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ধর্মীয় আবেগ, সামাজিক স্মৃতি ও লোকঐতিহ্যের একটি বিস্তৃত পরিসর।

কিন্তু ইসলামের ইতিহাস ও শরিয়তের আলোচনায় আবেগের পাশাপাশি দলিলের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি বিষয় সমাজে বহুদিন ধরে প্রচলিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তের বিধান হয়ে যায় না। আবার কোনো একটি রীতি শরিয়ত-নির্ধারিত ইবাদত না হলেই তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি সামাজিক কাজও নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। আখেরি চাহার শোম্বাকে বুঝতে হলে তাই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শরিয়তের এই তিনটি ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

আখেরি চাহার শোম্বার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার একটি স্মৃতি প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি অসুস্থতার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে দিনটি আনন্দ, শুকরিয়া, দান-সদকা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। উপমহাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এই বর্ণনা বহুদিন ধরে প্রচলিত এবং মানুষের ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু সহিহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলোতে সফর মাসের শেষ বুধবারকে একটি স্বতন্ত্র শরিয়তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতা ও তাঁর শেষ জীবনের ঘটনাবলি সহিহ সূত্রে বিস্তৃতভাবে সংরক্ষিত হলেও ‘সফরের শেষ বুধবার’কে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করার সুস্পষ্ট নববী নির্দেশ পাওয়া যায় না।

এই জায়গাটিই আখেরি চাহার শোম্বা নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা। কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং কোনো শরিয়ত-নির্ধারিত ইবাদত এক বিষয় নয়। একটি সমাজ কোনো ঘটনাকে স্মরণ করতে পারে, সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক আয়োজন করতে পারে; কিন্তু কোনো দিনকে নির্দিষ্ট ইবাদতের জন্য বিশেষ মর্যাদা দিতে হলে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল প্রয়োজন। ইসলামের ইবাদতের ক্ষেত্রে এই নীতিই মূল মাপকাঠি।

চার মাযহাবের ইমাম- ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)- এর কারও নামে আখেরি চাহার শোম্বার প্রচলিত বিশেষ নামাজ বা বিশেষ রোজা সম্পর্কে সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য কওল পাওয়া যায় না। ফলে তাঁদের নামে এমন বক্তব্য উদ্ধৃত করা, যার মূল কিতাবি সূত্র নিশ্চিত নয়, তা একজন লেখকের জন্যও নিরাপদ নয় এবং পাঠকের জন্যও বিভ্রান্তিকর। চার ইমামের প্রত্যেকের ফিকহি ঐতিহ্যে ইবাদতকে শরিয়তি দলিলের অধীন রাখার যে মৌলিক নীতি রয়েছে, সেটিই এ বিষয়ে যথেষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়।

ইমাম মালিক (রহ.)-এর ফিকহি ঐতিহ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের যুগে দ্বীনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না থাকা কোনো বিষয়কে পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানোর ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা দেখা যায়। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর রচনায়ও সুন্নাহর বিপরীতে নতুন ধর্মীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত আলোচনা রয়েছে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর হাদিসনির্ভর ফিকহি ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রমাণিত সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি পদ্ধতিতেও শরিয়তের বিধানকে কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের বক্তব্য ও স্বীকৃত ফিকহি উসুলের আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং তাঁদের নামে আখেরি চাহার শোম্বার কোনো নির্দিষ্ট নামাজের কওল না থাকলেও তাঁদের ফিকহি পদ্ধতির মৌলিক শিক্ষা পরিষ্কার- ইবাদতের বিশেষত্ব মানুষের প্রচলন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তার জন্য শরিয়তি ভিত্তি প্রয়োজন।

এই নীতির আলোকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সফরের শেষ বুধবারের বিশেষ চার রাকাত নামাজ। উপমহাদেশের কিছু অঞ্চলে প্রচলিত আছে, এদিন নির্দিষ্ট সময়ে চার রাকাত নফল নামাজ পড়তে হবে এবং প্রতিটি রাকাতে নির্দিষ্ট সংখ্যায় নির্দিষ্ট সূরা পড়তে হবে। নামাজ শেষে বিশেষ দোয়া ও কিছু নির্দিষ্ট আয়াত পাঠের রীতিও কোথাও কোথাও প্রচলিত। কখনো এর সঙ্গে বছরের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশেষ ফজিলতের কথাও বলা হয়।

কিন্তু এই নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাজের ব্যাপারে প্রামাণ্য আলেমদের বড় একটি অংশ স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছেন। সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহুসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা’ সফরের শেষ বুধবারের এই বিশেষ চার রাকাত নামাজ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছে, কোরআন ও সুন্নাহতে এর কোনো ভিত্তি তারা জানে না এবং সালাফদের কাছ থেকেও এর আমল প্রমাণিত নয়। ফতোয়া সংকলনে এ বিষয়ে এটিকে ভিত্তিহীন ধর্মীয় সংযোজন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বোঝা প্রয়োজন। নফল নামাজ নিজে ইসলামে বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। একজন মুসলমান যেকোনো বুধবারে নফল নামাজ পড়তে পারেন, কোরআন তিলাওয়াত করতে পারেন, দরুদ পড়তে পারেন, দোয়া করতে পারেন। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বুধবারকে নির্দিষ্ট সংখ্যার রাকাত, নির্দিষ্ট সূরা ও নির্দিষ্ট ফজিলতের সঙ্গে শরিয়ত-নির্ধারিতভাবে যুক্ত করতে হলে আলাদা দলিল প্রয়োজন। অর্থাৎ, ‘নফল নামাজ পড়া’ এবং ‘সফরের শেষ বুধবারের জন্য বিশেষ নফল নামাজ নির্ধারণ করা’ একই বিষয় নয়।

এই পার্থক্যটি না বুঝেই অনেক সময় সাধারণ নেক আমলও একটি নির্দিষ্ট দিনের বিশেষ সুন্নাহ হিসেবে সমাজে প্রচারিত হয়ে যায়। অথচ কোনো আমল সাধারণভাবে বৈধ হওয়া আর কোনো নির্দিষ্ট সময়, স্থান বা পদ্ধতির সঙ্গে তাকে শরিয়তের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে যুক্ত করা- দুটি পৃথক বিষয়।

সফরের শেষ বুধবারকে ঘিরে বিশেষ রোজার প্রচলনও কিছু অঞ্চলে দেখা যায়। কিন্তু এই দিনটিকে আলাদা করে বিশেষ ফজিলতের রোজার দিন হিসেবে নির্ধারণ করার নির্ভরযোগ্য শরিয়তি প্রমাণ পাওয়া যায় না। কেউ যদি সাধারণ নফল রোজা রাখেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত নফল ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু ‘সফরের শেষ বুধবারের বিশেষ রোজা’ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠা করতে গেলে নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের আমল থেকে দলিল প্রয়োজন।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সফর মাসকে অমঙ্গল বা দুর্ভাগ্যের মাস মনে করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। জাহেলি যুগের মানুষের মধ্যে সময়, মাস বা বিভিন্ন ঘটনাকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই ধরনের কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে সফর সম্পর্কে জাহেলি কুসংস্কার প্রত্যাখ্যানের বর্ণনা রয়েছে। ফলে সফরের শেষ বুধবারকে নিজস্বভাবে অমঙ্গলের দিন মনে করা যেমন ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি এদিন বিশেষ বিপদ নেমে আসে এবং বিশেষ কিছু আমল না করলে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়- এমন বিশ্বাসেরও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

আখেরি চাহার শোম্বার সঙ্গে সমাজে আরও কিছু রীতি যুক্ত হয়েছে। কোথাও কাগজে নির্দিষ্ট আয়াত লিখে পানিতে ভিজিয়ে পান করা হয়, কোথাও বিশেষ দোয়া ও ওজিফা নির্দিষ্ট সংখ্যায় পাঠ করা হয়, কোথাও বিশেষ খাবার তৈরি করে এটিকে ধর্মীয় কর্তব্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। এসবের কোনোটি যদি সাধারণভাবে দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, দান বা সামাজিক আপ্যায়নের পর্যায়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি একরকম। কিন্তু এগুলোকে ‘এই দিনের শরিয়তি আমল’ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য দলিল প্রয়োজন।

ইসলামী জ্ঞানচর্চায় বিদআতের আলোচনাও এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বিদআত শব্দটি নিয়ে সমাজে নানা ধরনের বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় ইবাদতের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো, কোনো কাজকে কি এমনভাবে দ্বীনের অংশ বানানো হচ্ছে, যার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা শরিয়তি প্রমাণ নেই? যদি কোনো সাধারণ বৈধ কাজকে নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট ফজিলতের সঙ্গে ধর্মীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন সেটি বিদআতের আলোচনার মধ্যে পড়ে।

তবে এ কথা বলাও জরুরি যে, আখেরি চাহার শোম্বায় কেউ যদি অসহায় মানুষকে খাবার দেন, দরিদ্রকে সাহায্য করেন, কোরআন পড়েন, দরুদ পড়েন কিংবা আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, এসব নেক কাজকে শুধু দিনটির কারণে নিষিদ্ধ বলা সঠিক নয়। কারণ এসব আমলের বৈধতা অন্য দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আপত্তির জায়গা তখনই আসে, যখন বলা হয়, ‘এই দিন হওয়ায় এই কাজের বিশেষ শরিয়তি ফজিলত রয়েছে।’

একটি সাধারণ দান সদকা। কিন্তু সেটিকে একটি নির্দিষ্ট দিনের অপরিহার্য ধর্মীয় বিধান বানানো আলাদা বিষয়। একটি সাধারণ নফল নামাজ। কিন্তু সেটিকে সফরের শেষ বুধবারের নির্দিষ্ট চার রাকাত সুন্নাহ বলা আলাদা বিষয়। একটি সাধারণ দোয়া। কিন্তু সেটিকে এই দিনের বিশেষ বিপদনাশক দোয়া বলা আলাদা বিষয়। ধর্মীয় আমল বোঝার ক্ষেত্রে এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই সবচেয়ে জরুরি।

আখেরি চাহার শোম্বা নিয়ে তাই একদিকে রয়েছে মানুষের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, অন্যদিকে রয়েছে শরিয়তের দলিলনির্ভর মাপকাঠি। এই দুটিকে সংঘর্ষে না এনে সঠিক জায়গায় রাখা সম্ভব। ঐতিহ্যকে ইতিহাস হিসেবে জানা যায়, মানুষের আবেগকে সম্মান করা যায়; কিন্তু শরিয়তের বিধান নির্ধারণে আবেগের পরিবর্তে দলিলকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।

ইসলামের ইতিহাসে বহু সামাজিক রীতি সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়েছে। সব সামাজিক রীতিই যে শরিয়তি বিধান, এমন নয়। আবার সব সাংস্কৃতিক রীতিই যে ধর্মবিরোধী, তাও নয়। কোনো রীতি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধানের বিরোধী কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আখেরি চাহার শোম্বার ক্ষেত্রেও তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।

এই ভারসাম্যের অর্থ হলো, সফরের শেষ বুধবারকে শরিয়ত-নির্ধারিত ঈদ, উৎসব বা বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে ঘোষণা না করা; একই সঙ্গে সাধারণ নেক কাজ, দান-সদকা ও কোরআন তিলাওয়াতকে নিষিদ্ধও না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো তাঁর প্রমাণিত সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর নামে এমন কিছু না বলা, যা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়।

ধর্মীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই- সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে ঐতিহ্যকে মুছে ফেলতে হয় না; বরং ঐতিহ্যের কোন অংশ ইতিহাস, কোন অংশ সংস্কৃতি এবং কোন অংশ শরিয়ত, তা স্পষ্ট করে দিতে হয়।

আখেরি চাহার শোম্বার ক্ষেত্রেও সেই স্পষ্টতাই প্রয়োজন। দিনটি মুসলিম সমাজের একটি পরিচিত ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে। মানুষ এদিন নবীজি (সা.)-এর জীবন স্মরণ করতে পারে, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করতে পারে, দান-সদকা করতে পারে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এমন কোনো নির্দিষ্ট নামাজ, নির্দিষ্ট রোজা, নির্দিষ্ট সূরা বা নির্দিষ্ট ফজিলতকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়, যার পক্ষে সহিহ ও নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।

চার ইমামের নামে অপ্রমাণিত বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের ফিকহি উসুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই উত্তম। পরবর্তী যুগের আলেমদের মতামতও সেই দলিলনির্ভর পদ্ধতির আলোতেই মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ কোনো আলেমের মতামত গ্রহণের আগে তাঁর বক্তব্যের উৎস, কিতাব ও প্রেক্ষাপট জানা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো আমলকে বিদআত বলার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা জরুরি।

আখেরি চাহার শোম্বা তাই শুধু একটি বুধবারের নাম নয়; এটি আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি আয়না। এই আয়নায় একদিকে দেখা যায় নবীজি (সা.)-এর প্রতি মুসলমানের গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে দেখা যায় সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়ে যাওয়া নানা রীতি। সেই আয়নাকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

ঐতিহ্য থাকুক, কিন্তু কুসংস্কার নয়। ভালোবাসা থাকুক, কিন্তু অপ্রমাণিত দাবি নয়। নফল ইবাদত থাকুক, কিন্তু শরিয়তের নামে মনগড়া নির্দিষ্টতা নয়। দান-সদকা থাকুক, কিন্তু তার সঙ্গে ভিত্তিহীন ফজিলতের গল্প নয়।

কারণ নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ তাঁর নামে নতুন কিছু সংযোজন করা নয়; বরং তিনি যে কোরআন ও সুন্নাহ রেখে গেছেন, তার আলোয় নিজের জীবনকে সাজানো। আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সবচেয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎও সেখানেই, যেখানে আবেগ থাকবে, ইতিহাস থাকবে, মানুষের ভালোবাসা থাকবে; কিন্তু সবকিছুর ওপরে থাকবে কোরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং জ্ঞানভিত্তিক আমানতদারি।

তথ্যসূত্র

সূরা আল-মায়িদাহ- ৫:৩; সূরা আল-আহযাব- ৩৩:২১; সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুস সালাম, হাদিস ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৮; ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৪; মুহাম্মদ আবদুস সালাম আশ-শুকাইরি, আস-সুনান ওয়াল-মুবতাদাআত

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।

এম আর এ